বাগেরহাট সদর উপজেলার উৎকুল এলাকার পল্লী চিকিৎসক হাওলাদার মোহাম্মদ আলী খেজুরের বিচি দিয়ে কফি তৈরি করে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুরের বিচিকে কাজে লাগিয়ে নতুন একটি সম্ভাবনাময় পণ্য তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
মোহাম্মদ আলী জানান, খেজুরের মৌসুমেই মূলত এই কফি উৎপাদন করা হয়। খেজুরের কাঁদি প্রতি ২০ টাকা দরে কিনে তা থেকে বিচি সংগ্রহ করা হয়। পরে বিচিগুলো পানিতে ভিজিয়ে পরিষ্কার করা হয়। খোসা ছাড়িয়ে রোদে শুকানোর পর কড়াইয়ে বালির সঙ্গে ভেজে এরপর মেশিন বা ব্লেন্ডারে গুঁড়া করে কফি প্রস্তুত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না।
এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ কিনতে আসছেন। ভবিষ্যতে অনলাইনে বাজারজাত করে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এই পণ্য পৌঁছে দিতে চান এই উদ্যোক্তা।
এদিকে মোহাম্মদ আলীর এমন উদ্যোগে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে কয়েকজন বেকার যুবকের। প্রতিদিন মোহাম্মদ আলীকে সহায়তার জন্য পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। আর এ জন্য তাদের জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়।
উৎপাদন কাজে নিয়োজিত শ্রমিক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খেজুরের মৌসুমে এখানে কাজ করে আয় করতে পারছি। বিচি সংগ্রহ, পরিষ্কার, শুকানো ও ভাজার কাজ করি। এই উদ্যোগের কারণে এলাকার কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।’
স্থানীয়দের মতে, খেজুরের বিচি দিয়ে তৈরি এই কফির স্বাদ ও ঘ্রাণ ভিন্নধর্মী হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অবহেলিত একটি উপকরণকে কাজে লাগিয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা বলেন, ‘প্রথমে বিষয়টি শুনে অবাক হয়েছিলাম। পরে খেজুরের বিচির কফি পান করে দেখেছি। এর স্বাদ ও ঘ্রাণ বেশ ভালো। এলাকার মানুষও আগ্রহ নিয়ে কিনছেন। এটি বাগেরহাটের জন্য একটি নতুন উদ্যোগ।’
৭০ বছর বয়সী নূর ইসলাম বলেন, ‘আমি নিয়মিত এই কফি পান করছি। আমার ডায়াবেটিসের কিছুটা উপকার পেয়েছি বলে মনে হচ্ছে। স্বাদও ভালো লাগছে। তবে আমার এই বয়সে এমন কফি খাই নাই।’
ইউটিউবে খেজুরের বিচি দিয়ে কফি তৈরির ভিডিও দেখে বিষয়টি কাজে লাগানোর আগ্রহ তৈরি হয় হাওলাদার মোহাম্মদ আলীর। এরপর নিজ উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু করেন। তিনি দাবি করেন বাগেরহাট জেলায় তিনিই প্রথম খেজুরের বিচি দিয়ে কফি তৈরি করছেন।
মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সৌদি আরবে যদি খেজুরের বিচি দিয়ে কফি তৈরি করা যায়, তাহলে আমরা কেন পারব না—এই চিন্তা থেকেই কাজ শুরু করি। প্রায় ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে উৎপাদন শুরু করেছি। বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের দৈনিক ৫০০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়।’
এ বিষয়ে বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, ‘খেজুরের বিচি সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। সেই বিচি ব্যবহার করে মূল্য সংযোজনমূলক পণ্য তৈরি করা একটি ইতিবাচক ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে খেজুরের বিচি থেকে তৈরি কফির স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে হলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরীক্ষার প্রয়োজন।’