ডিসি পদ
টাকা যেখানে সবকিছু, সেখানে নৈতিকতা এক সস্তা মরীচিকা। অনিয়ম আর দুর্নীতির চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) অন্দরে এবার বেজে উঠেছে লুণ্ঠনের এক নতুন সুর। যেন এক আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস. এম. সরওয়ার কামাল। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার মূলে কুঠারাঘাত, ক্ষিপ্র চাঁদাবাজি, স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ এবং সবশেষে আট কোটি টাকার বিনিময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) হওয়ার এক অবিশ্বাস্য ‘অঙ্গীকারনামা’—সব মিলিয়ে চসিকে যেন চলছে এক রূপকথার মেগা কেলেঙ্কারি।
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের এই উপসচিব চসিকে যোগ দিয়েছিলেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় তার ‘ক্ষুধার’ পরিধি চসিকের গণ্ডি পেরিয়ে এবার গ্রাস করতে চেয়েছে গোটা এক জেলাকে। কুমিল্লার ‘ডিসি’ পদে বসার তীব্র মোহে আট কোটি টাকার যে চুক্তিপত্র আর গোপন অঙ্গীকারনামা প্রকাশ্যে এসেছে, তা এখন খোদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের টেবিলে। গত ১৩ মে (২০২৬) সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে তিন কার্যদিবসের কঠোর ‘কারণ দর্শানোর নোটিশ’।
মন্ত্রণালয়ের সিটি কর্পোরেশন-২ শাখার নোটিশে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর প্রশাসনিক দেউলিয়াত্বের গল্প। অভিযোগের আঙুল বলছে, সরওয়ার কামাল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে উদ্দেশ্য করে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়নের এক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। শর্ত কী? নিয়োগ নিশ্চিত হলেই নগদ আট কোটি টাকা পৌঁছে যাবে নির্দিষ্ট হাতে! শুধু তাই নয়, ডিসি হওয়ার পর তিনি মনোনীত রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের ইশারা অনুযায়ী ‘সমন্বয়’ করে চলবেন—এমন মুচলেকাও দিয়েছেন সেই পত্রে।
যদিও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন এই চুক্তির কথা অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তিনি সরওয়ার কামাল নামের কাউকেই চেনেন না। আর অভিযুক্ত কর্মকর্তা একে বলছেন ‘স্বাক্ষর জাল’ করার ভুয়া নাটক। তবে খোদ চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন এই আট কোটির গুঞ্জনে বিব্রত হয়ে বলেছেন, ‘যেহেতু মন্ত্রণালয় দেখছে, আমি হস্তক্ষেপ করছি না। তবে এর সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত।’
এই লুণ্ঠনের প্রাসাদে সত্যের আলো ফেলতে গিয়ে গত ৭ মে নির্মম অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছে সংবাদমাধ্যম ‘বাংলাধারা’র রিপোর্টার ওমর ফারুককে। চসিকের রাজস্ব বিভাগের দুর্নীতির পাহাড় নিয়ে বক্তব্য নিতে গিয়ে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার কক্ষে তিনি যেন এক মায়াবী খাঁচায় বন্দি হন। দুপুর ১২টা ৩৫ থেকে ১টা ১৯ মিনিট—এই ৪৪ মিনিট আটকে রাখা হয় স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠস্বর।
কেড়ে নেওয়া হয় মুঠোফোন, তল্লাশি চালানো হয় ব্যক্তিগত গ্যালারি আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপন চ্যাটে। শুধু তা-ই নয়, পরিবারকে ফোন করে হুমকি আর সাংবাদিককে ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যা দিয়ে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর যে ভয় দেখানো হয়েছে, তা মুক্ত সাংবাদিকতার দেওয়ালে এক বিশাল কলঙ্কের দাগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চসিকের রাজস্ব বিভাগ যেন এক সুসংগঠিত অর্থ আদায়ের ‘কালো সিস্টেম’। ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ বলছে, সরওয়ার কামাল এক সুনিপুণ জাদুকরের মতো টিও, ডিটিও এবং কর আদায়কারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা তোলেন। কর্মচারীদের ‘স্কেল প্রদান’-এর নামে একাই হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৬০ লাখ টাকা!
সবচেয়ে অদ্ভুত এক ‘মিটিং বাণিজ্য’র গল্প ফুটে উঠেছে এই দপ্তরে। প্রতি মাসে আপ্যায়নের নামে একেকটি মিটিং থেকে কাটা হয় ২০ হাজার টাকা। আর মাসে এমন মিটিং হয় গড়ে ২২টি! অর্থাৎ, স্রেফ চা-সমুচার আড়ালে মাসে হাতবদল হয় লাখ লাখ টাকা। এছাড়া ‘সার্কেল ভিজিট’-এর নামে প্রতিবার ৩০-৪০ হাজার টাকা আদায়, জোর করে ‘পিকনিকের চাঁদা’ নেওয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে হোল্ডিং চেক জমা দিয়ে সেখান থেকে কম্পিউটার ও এলইডি টিভির মতো ব্যক্তিগত ‘উপহার’ গ্রহণের মহোৎসব চলছে রাজস্ব বিভাগে। আর এই পুরো সাম্রাজ্য পাহারা দিতে বিভিন্ন সার্কেলে বসানো হয়েছে নিজস্ব ‘দালাল বাহিনী’।
আইনের শাসন আর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্ষমতার চেয়ারকে যারা নিলামের টেবিল বানাতে চান, সরওয়ার কামাল তাদের এক জ্বলন্ত প্রতীক। আট কোটির বিনিময়ে রাজদণ্ড কেনার এই বাসনা আর সিন্দুক লুটের এই মহাকাব্যের শেষ কোথায়, তা এখন মন্ত্রণালয়ের তদন্তের অধীন। কিন্তু ভাঙা বেড়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ নাগরিক ও আমানতকারীরা আজ কর গুনে মরছেন, আর ভেতরের রাজারা সেই টাকায় সাজাচ্ছেন ডিসি হওয়ার ‘মাস্টার ব্লুপ্রিন্ট’।