সংসারের অভাব কাটাতে ও ধারদেনা শোধ করতে তিন বছর আগে লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামের ২৫ বছর বয়সী তরুণ শুভ দাস। কিন্তু গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি। শুভর এই আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবার এখন দিশেহারা।
শুভকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে তার বাবা ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস নিজের একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই এক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এরপরও শেষ রক্ষা না হওয়ায় চড়া সুদে এনজিও এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নেন। ভিটেমাটি হারিয়ে গত তিন বছর ধরে সপরিবারে মাসিক এক হাজার টাকা ভাড়ার একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন সুরঞ্জিত।
সুরঞ্জন দাস জানান, শুভ প্রতি মাসে দেশে ৩৫ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়েই ঋণের কিস্তি শোধ এবং তার ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ চলত। তবে লেবাননের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত দুই মাস ধরে তিনি কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি, যা নিয়ে মৃত্যুর আগে রোববার রাতেও ছোট বোন সাধনার সঙ্গে শেষ ফোনালাপে গভীর আফসোস প্রকাশ করেছিলেন শুভ।
বর্তমানে শ্রীপতিপুর গ্রামের শুভর ভাড়া বাড়িতে চলছে মাতম। জরাজীর্ণ ঘরের দাওয়ায় বসে মা শিখা দাস ও বোন সাধনা দাস অনবরত বিলাপ করছেন।
একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে ভ্যানের ওপর নির্বাক হয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা সুরঞ্জন দাস।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রতিবেশীরা শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে ভিড় করছেন। সবার চোখেমুখে এখন একটাই আকুতি, ছেলের মুখটা যেন শেষবারের মতো দেখতে পান।
শুভর ছোট বোন সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, ‘দাদাই আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাত। দাদাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু এখন আমরা থাকব কোথায়? আমাদের পড়াশোনাই বা হবে কীভাবে?’
পরিবারটির এই চরম সংকটময় মুহূর্তে শুভর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং এনজিওর ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শুভর পরিবার যাতে দ্রুত মরদেহ ফিরে পায়, সে জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছি এবং সরকারিভাবে সব ধরনের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানিয়েছেন, প্রবাসীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।