শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অঞ্চলে বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে হানা দিয়েছে আগাম বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়া। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢলে আত্রাই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চলনবিলের সিংড়ার হাজার হাজার কৃষকের ‘সোনার ফসল’ এখন হুমকির সম্মুখীন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিংড়ার বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মাঠের পর মাঠ ফসল বাঁচাতে নিরুপায় কৃষকরা এখন প্রকৃতির সাথে এক অসম ও মরণপণ যুদ্ধে নেমেছেন। এ বছর সিংড়া উপজেলায় প্রায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে।
বিপর্যস্ত এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন নাটোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন এবং কৃষকদের মনোবল বাড়াতে আশ্বাস দিচ্ছেন।
সিংড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে। একদিকে নদীর পানি বিলে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে সেই পানি ঠেকাতে স্থানীয় জনতা ও কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়ে কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি ধান কাটতে কাজ করছে মহিলারাও।
এদিকে, সিংড়া পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের হাঁসপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন অকেজো স্লুইসগেটটি এখন কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিক দিয়ে পানি প্রবেশ করায় হাঁসপুকুরিয়া, নিংগইন, খরমকুড়ি ও তাজপুর বিলের প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমির ধান সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে।
সিংড়া অভয়ারণ্যের পাশে অবস্থিত স্লুইসগেট দিয়েও পানি বিলে প্রবেশের চেষ্টা করছে। সেখানে সতর্ক অবস্থানে থেকে কৃষকরা ডালি কোদাল দিয়ে মাটি কেটে বাদ দিয়ে পানি ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শেরকোল ইউনিয়নের জোরমল্লিকা এলাকায় আত্রাই নদীর পানি বাড়ায় কৃষকরা মাটির বাঁধ দিয়ে হাজার হাজার বিঘা জমির ধান রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। বর্তমানে সেখানে ভেকু (Excavator) দিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে।
সিংড়া পৌর এলাকার পাটকোল কতুয়াবাড়ি ব্রিজের নিচ দিয়ে ইতোমধ্যে বালুভরা বিলে পানি প্রবেশ করেছে। সেখানে কৃষকরা তাদের জমির আধাপাকা ধান কেটে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
শুধু হাঁসপুকুরিয়া স্লুইসগেট, সিংড়া অভয়ারণ্য এলাকায় স্লুইসগেট, জোরমল্লিকা ব্রিজ, পাটকল কতুয়াবাড়ি ব্রিজ এলাকা নয়, উপজেলার দক্ষিণ দমদমা, জোলার বাতা, হিয়ালাবিলসহ চলনবিলের বিভিন্ন নিচু এলাকায় খাল-বিলের পানি বৃদ্ধি পেয়ে ফসলি জমিতে ঢুকতে শুরু করেছে। মাঠের পর মাঠ ধান পেকে থাকলেও টানা বৃষ্টির কারণে শ্রমিকরা কাজ করতে পারছেন না, ফলে পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
অন্যদিকে, সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় বসে না থেকে গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে বালুর বস্তা সংগ্রহ করে এক রকম ফসল বাঁচানোর যুদ্ধে নেমেছেন স্থানীয়রা।
হাঁসপুকুরিয়া গ্রামের শাকিল হোসেন বলেন, আমরা গ্রামবাসী ও কৃষকেরা একত্রিত হয়ে গত কয়েকদিন ধরে এই ভাঙা স্লুইসগেটের মুখে বালুর বস্তা ফেলছি। কিন্তু নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই অস্থায়ী বাঁধ কতক্ষণ টিকবে তা নিয়ে আমরা সবাই চিন্তিত।
মাঠের পর মাঠ ধান পেকে থাকলেও তা ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। হাঁসপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, আমার ১২ বিঘা জমির ধান এখন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সারা বছরের খোরাক এই মাঠেই পচে যাওয়ার দশা হয়েছে। একই আশঙ্কার কথা জানান কৃষক হানিফ প্রামানিক, তার ৭ বিঘা জমির ধান বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এ বছর সিংড়া উপজেলায় প্রায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বন্যার আতঙ্কের সাথে যুক্ত হয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট ও প্রতিকূল আবহাওয়া। রোদের দেখা না থাকা এবং বৃষ্টির কারণে শ্রমিকরা কাজ করতে চাচ্ছেন না, ফলে পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে গুরুত্বের সাথে কাজ করছে। তিনি নিজেই বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে কৃষকদের দাবি, প্রতিবছর এভাবে অস্থায়ী মাটির বাঁধ বা বালুর বস্তা দিয়ে ফসল রক্ষা করা সম্ভব নয়। তারা এই সংকট উত্তরণে উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, যেন দ্রুত আধুনিক ও স্থায়ী উপায়ে পানি প্রবেশ বন্ধ করে তাদের কষ্টার্জিত ফসল রক্ষা করা হয়।
এ বিষয়ে নাটোর ৩ সিংড়া আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আগাম বন্যার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছি। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি।
সংসদ অধিবেশন শেষ করেই আমি সরাসরি এলাকায় চলে এসেছি। বর্তমানে আমি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করছি এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে জোরমল্লিকা ব্রিজের নিচে ভেকু পাঠিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছি। আমার নির্বাচনী এলাকার কোথাও বিলে পানি প্রবেশ করার খবর পাওয়া মাত্রই আমি সেখানে ছুটে যাচ্ছি। জনগণের জানমাল রক্ষায় আমি এবং প্রশাসন সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছি। সিংড়া উপজেলার শেষ সীমান্ত গুরুদাসপুরের রাবারড্যামটি খুলে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এর ফলে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি নেমে যাবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’