দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথ জীউ মন্দির প্রাঙ্গণে ১৩ দিনব্যাপী মেলা শুরু হয়েছে। দোল পূর্ণিমা উৎসব ও মেলাকে ঘিরে আনন্দে মেতেছে উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম। ছোট বড় সকলের মজার একটি খোরাক ও মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো ঘোড়া দৌড় খেলা। যে ঘোড়া যত দৌড়াবে, ক্ষিপ্রতা, শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা বেশি থাকবে সেই ঘোড়ার কদরও বাড়বে।
নওগাঁর ধামইরহাট থেকে এসেছে যুবরাজ (ঘোড়া)। যুবরাজকে দেখতে ভির করছে শতশত দর্শনার্থীরা। কেউ কাছে গিয়ে ফেলফি তুলছে, আবার কেউ আদর করতে হাত বাড়াচ্ছে। যুবরাজের দাপটে কাপছে বাঁকি ঘোড়ারা। এই মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি তৎপর স্থানীয়রা।
এবারের মেলায় এসেছে দেশের নানা প্রান্তের বাহারি ঘোড়া। কালোরাজা, যুবরাজ, রাজাবাবু, পুঙ্খিরাজ, সুইটি, জলন্ত আগুন, ভারতীয় তাজী, সিন্ধি, মারোয়াড়ীসহ বাহারি নামের এসব ঘোড়া দেখতে ভিড় করছে মানুষ। ক্রেতারা তাদের পছন্দের ঘোড়া কিনতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। গত কয়েক বছরের চেয়ে বেশি ঘোড়া বিক্রি হয়েছে এবার বলছেন ঘোড়া বিক্রতারা।
৫১৯তম ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথের এই মেলা একসময় ছিল অঞ্চলজুড়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত। এ মেলায় ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা বিক্রেতার আগমন ঘটতো, জানা যায় এই মেলায় উট, ঘোড়া, দুম্বা, গরু, মহিষসহ বিভিন্ন প্রাণির সমাগম হতো কালের বিবর্তনে মেলাটি ছোট হয়ে এসেছে। ছোট হলেও শেষ সময় মানুষের সহগমন চোখে পড়ার মতো।
গোপীনাথের প্রধান মন্দির থেকে শ্রী শ্রী গোপীনাথ জীউ সহ পনেরো সখীর বিগ্রহ বাজার মন্দিরে ঢাক ঢোল সানাই কাশি বাজিয়ে আগমনের মধ্য দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের গোপীনাথপুরে দোলযাত্রা মেলা শুভ সূচনা হয়। রীতি অনুযায়ী গোপীনাথপুর বাজার মন্দিরে শ্রী শ্রী গোপীনাথ জীউ অবস্থান পর্যন্ত ১৩ দিনব্যাপী চলবে এই মেলা। আবার ১৩দিন পর পুনরায় ফিরে যাবেন প্রধান মন্দিরে।
মেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই মন্দিরের কয়েক একর জায়গা জুড়ে জমির উপরে বসেছে ঘোড়া, মহিষ হাট। চলছে পুরো দমে বেচা-কেনা।
নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থেকে আসা ঘোড়া ব্যবসায়ী সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আমরা বাব-দাদার আমল থেকে এ মেলায় ঘোড়া ক্রয়-বিক্রয় করে আসছি। আমি এবার পাঁচটি ঘোড়া নিয়ে এসেছি। তার মধ্যে এখন পর্যন্ত সব চেয়ে বড় ঘোড়া আমার যুবরাজ। দাম চেয়েছি ১১ লাখ। ক্রেতার চাহিদা না থাকায় ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে। গত কয়েকবারের চেয়ে এবার বেচা-বিক্রি ভালো হয়েছে। আমার ছোট ঘোড়াগুলো বিক্রি হয়েছে।’
দিনাজপুর থেকে আসা ঘোড়া বিক্রেতা মো. লায়েক হোসেন বলেন, ‘‘এই মেলায় প্রথম এসেছি। মেলায় আমার ‘কালোরাজা’ নামক ভারতীয় তাজি ঘোড়াটি ৪ লাখ টাকা দাম ধরা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি ঘোড়া নিয়েছি।’’
জয়পুরহাট জেলার ধারকী গ্রামের মহিষ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, ‘প্রতিবছর এই মেলায় মহিষ নিয়ে এসে বেচাকেনা করি। এবার ১০ জোড়া মহিষ বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছি। এর মধ্যে এক জোড়া মহিষ সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা দাম উঠেছে।’
গোপীনাথের মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মহিষ ও ঘোড়া বেচা-কেনা। সৌখিন কাঠের আসবাবপত্র, বিভিন্ন রকম মসলাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র পাওয়া যায়। আরও রয়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দেশী-বিদেশী কম্বলের দোকান, কাঠের আসবাবপত্র ও বাহারী মিষ্টির দোকান। প্রতিবারের মতো এবারো মেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বাহারী সামগ্রী, মোটরসাইকেল খেলা, নাগরদোলাসহ খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে।
শ্রী শ্রী গোপীনাথ জীউ মন্দিরের সেবায়েত শ্রী রনেন্দ্র কৃষ্ণ প্রিয়া বলেন, এই ঐতিহাসিক মেলা দোল পূর্ণিমাকে ঘিরে আদিকাল থেকে হয়ে আসছে।
গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেলা কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, ঘোড়ার মেলা হলেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সব আয়োজনই রাখা হয়েছে। মেলায় ঘোড়া এক সপ্তাহ থাকে। তবে রমজান মাসের কারণে সার্কাস ও যাত্রাপালার মতো বিনোদনমূলক আয়োজন বন্ধ রাখা হয়েছে। ঈদের পর প্রশাসন অনুমতি দিলে বিনোদনমূলক আয়োজন রাখা হবে।