আকিজ বশির গ্রুপের পরিবেশনায়, এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর সঞ্চালনায় এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও বিজিএমইএ-এর সহযোগিতায় শনিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাসটেইনাবিলিটি সামিট ২০২৬। এটি ছিল এই সামিটের ৪র্থ সংস্করণ।
বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম ও সাসটেইনেবল ব্র্যান্ড ইনিশিয়েটিভের আয়োজনে এবং বাংলাদেশ ইনোভেশন কনক্লেভের উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী এই সম্মেলনে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, শিল্প বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তারা অংশ নিয়ে টেকসই ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চা নিয়ে অগ্রগামী আলোচনায় যুক্ত হন এবং পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।
সামিটে ৩টি কি-নোট সেশন, ২টি প্যানেল আলোচনা, ৩টি ইনসাইট সেশন, ২টি কেস স্টাডি, একটি এক্সপার্ট ডিপ ডাইভ এবং একটি পলিসি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়। সেশনগুলোতে দায়বদ্ধতা থেকে কার্যকর প্রভাব এবং কমপ্লায়েন্স থেকে দায়িত্বশীল আচরণে উত্তরণের রূপরেখা তুলে ধরা হয়, যেখানে প্রাধান্য পায় টেকসইতা ও দায়িত্বশীল ব্যবসা কীভাবে ব্যবসায়িক মডেল পুনর্গঠন করছে, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং দেশের অগ্রগামী প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘টেকসইতা এখন আর বছরে একবার আলোচনা করে ফেলে রাখার মতো কোনো ধারণা নয়—এটি এমন একটি চর্চা, যা প্রতিটি ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠানের মূল সত্তায় প্রোথিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ যখন ২০৩০ সালের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দায়িত্বশীল ব্যবসা কোনো বিকল্প নয়—এটাই আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তি। এখনই সময় দায়বদ্ধতা থেকে কার্যকর প্রভাবে এবং কমপ্লায়েন্স থেকে দায়িত্বশীল আচরণে উত্তরণের।’
সামিটের কি-নোট সেশনগুলোতে উঠে আসে বৈশ্বিক ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি। প্রধান অতিথি হিসেবে “সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স: মোবিলাইজিং ক্যাপিটাল ফর বাংলাদেশ’স গ্রিন ট্রানজিশন” শীর্ষক কি-নোট বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি দেশের কার্বন-নিঃসরণ হ্রাসমুখী রূপান্তরে পুঁজিবাজার ও সবুজ অর্থায়নের বিভিন্ন উপকরণ কীভাবে বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারে, তা তুলে ধরেন।
‘দ্য নেক্সট ইভলিউশন অব ক্যাপিটালিজম: বিজনেস, ব্র্যান্ডস অ্যান্ড সাসটেইনেবল ভ্যালু ক্রিয়েশন’ শীর্ষক ভার্চুয়াল কি-নোট সেশনে অংশ নেন নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের প্রফেসর ইমেরিটাস ফিলিপ কটলার এবং কানাডার রেসইন্ট সাসটেইনেবিলিটি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খালিদ হাসান। উদ্দেশ্যনির্ভর অর্থনীতিতে ব্র্যান্ডগুলো কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ও অংশীদারিত্বমূলক মূল্য তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে আলোকপাত করেন তারা।
‘হোয়াই সাসটেইনেবিলিটি ইজ দ্য নিউ গ্রোথ ইমপেরেটিভ’ শীর্ষক কি-নোট বক্তব্যে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার ফাউন্ডেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ড. শ্রামন ঝা উল্লেখ করেন, টেকসইতা এখন আর ব্যবসার প্রান্তিক বিষয় নয়—এটি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।
আয়োজনটিতে বক্তা হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন এম মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান অ্যান্ড ফাউন্ডার, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ; ড. মেলিতা মেহজাবীন, প্রফেসর, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি; সায়েফ নাসির, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড; ইয়াসির আজমান, চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, গ্রামীণফোন লিমিটেড; সাব্বির হাসান নাসির, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড (স্বপ্ন); বিদ্যা অমৃত খান, ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিজিএমইএ; ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, দেশ গ্রুপ অব কোম্পানিজ; মোহাম্মদ জাহিদুল্লাহ, চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার, ডিবিএল গ্রুপ; নুজহাত আনোয়ার, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি; কে এ এম মোরশেদ, সিনিয়র ডিরেক্টর, ব্র্যাক; এবং প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নুরুন্নবী, ইউনেসকো চেয়ার, এডুকেশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাকশনসসহ আরো বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীরা।
দিনব্যাপী অন্যান্য সেশন ও প্যানেল আলোচনায় নীতিগত ভাবনা থেকে বাস্তব প্রয়োগে উত্তরণের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। ইনসাইট সেশনগুলোতে আলোচনা হয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে দায়বদ্ধতাকে পরিমাপযোগ্য অংশীদারিত্বমূলক মূল্যে রূপান্তর করছে, তথ্য-উপাত্ত ও ইএসজি রিপোর্টিং কীভাবে ব্যবসায়িক আস্থার নতুন ভাষা হয়ে উঠেছে এবং শক্তিশালী ইএসজি কাঠামো কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে। দুটি প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে বোর্ডরুম থেকে বটম লাইন পর্যন্ত ব্যবসায়িক কৌশলে টেকসইতাকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত কীভাবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দায়িত্বশীল ব্যবসার নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। কেস স্টাডি উপস্থাপনায় গুরুত্ব পায় সবুজ প্রবৃদ্ধিতে কার্বন মার্কেটের সম্ভাবনা এবং টেকসইতা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য গল্প বলার চর্চা, আর এক্সপার্ট ডিপ ডাইভে বিশ্লেষণ করা হয় দেশের সাপ্লাই চেইনে দায়িত্বশীল ব্যবসার প্রকৃত তাৎপর্য। সমাপনী পলিসি ডায়ালগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শিল্প ও উন্নয়ন খাতের নেতৃবৃন্দ একমত হন যে, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ এখন আর কোনো বিকল্প নয়—এটি ভবিষ্যৎ ব্যবসার অপরিহার্য শর্ত।
বেসরকারি খাত, বিশেষ করে দেশীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মূল লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত সাসটেইনেবিলিটি সামিট ২০২৬-এ দায়িত্বশীল ব্যবসা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জাতীয় এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এর সঙ্গতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। সম্মিলিত উদ্যোগ, দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ও কার্যকর অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয় আয়োজনটিতে। দিনশেষে অনুষ্ঠিত হয় এসডিজি ব্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ডস গালা, যেখানে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিমাপযোগ্য প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মাননা জানানো হয়।
আয়োজিত সাসটেইনেবিলিটি সামিট ২০২৬-এর সাথে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভার্টাইজিং অ্যাসোসিয়েশন (আইএএ) বাংলাদেশ, এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন (এএমএফ) ও মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ (এমএসবি); পিআর পার্টনার হিসেবে ব্যাকপেজ পিআর; অফিসিয়াল ক্যারিয়ার পার্টনার হিসেবে টার্কিশ এয়ারলাইনস এবং হসপিটালিটি পার্টনার হিসেবে র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেল ঢাকা যুক্ত ছিল। সামিটটির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম ও সাসটেইনেবল ব্র্যান্ড ইনিশিয়েটিভ। সাসটেইনাবিলিটি সামিট ২০২৬ বাংলাদেশ ইনোভেশন কনক্লেভের একটি উদ্যোগ।