মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনায় আরও প্রকাশ্য হয়েছে ভারত। সন্ত্রাসবাদ, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা, বাণিজ্যনীতি ও অভিবাসন ইস্যুতে নয়াদিল্লির উদ্বেগ তুলে ধরেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে না। একই সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়াতেও নয়াদিল্লির উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস ধরে ভারত-মার্কিন সম্পর্কে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য বাড়ার পর নয়াদিল্লির বক্তব্যে এবার আগের তুলনায় আরও প্রকাশ্য সমালোচনার সুর দেখা যাচ্ছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা বাণিজ্য। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এতে ভারতের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল।
নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দেশের নীতিনির্ধারণ এমনভাবে হওয়া উচিত নয়, যাতে নিজের স্বার্থের বাইরে অন্য দেশের ওপর সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বিবেচনাই করা না হয়।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। কৃষি খাত দুই দেশের আলোচনার অন্যতম জটিল বিষয়। ভারতের কৃষকদের সুরক্ষায় দেশটির বাজার দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বাজার উন্মুক্ত করার প্রত্যাশার সঙ্গে নয়াদিল্লির অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, চুক্তি নিয়ে মোটামুটি একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন বাধা রয়ে গেছে। চুক্তি সম্পন্ন হলে তা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
বাণিজ্যের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সামরিক সংঘাতের পর বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে একটি হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নিহত হওয়ার পর ওই সংঘাত শুরু হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
তবে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত বরাবরই বলে আসছে, এটি ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং এতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার সুযোগ নেই। ট্রাম্প পরবর্তী সময়েও একাধিকবার যুদ্ধবিরতিতে নিজের ভূমিকার কথা বলায় নয়াদিল্লিতে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নেতৃত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতও করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের পরিধি অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নয়াদিল্লির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সন্ত্রাসবাদ।
পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একটি প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে বহু দশক ধরে ভারত যে ধরনের সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি হয়েছে, তা খুব কম দেশই হয়েছে। ভারতের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পর্যাপ্ত বোঝাপড়া ও সংবেদনশীলতা না পাওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সমস্যা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েটিগ বাজপেয়ি বলেন, জয়শঙ্করের বক্তব্য ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি ‘খোলামেলা মূল্যায়ন’। তাঁর মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর সময় ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী দেশগুলোর অন্যতম হলেও এখন সেই উজ্জ্বলতা অনেকটাই কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় পেশাজীবী যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে কর্মসূচিটিতে বিভিন্ন বাধা ও ব্যয় বাড়ায় বিষয়টি ভারতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জয়শঙ্কর বলেন, একসময় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মীদের চলাচলকে অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই অর্থনীতি ও রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও নয়াদিল্লির বর্তমান অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, অভিবাসন ও অন্যান্য বিষয়ে চাপের মুখে সরকারকে দেশের অভ্যন্তরেও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর ভারতীয় কৌশলগত মহলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ ছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য, শুল্ক, অভিবাসন এবং পাকিস্তান-কাশ্মীর ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য বাড়তে থাকে।
তবু বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশই সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে তা পুনর্গঠনের সুযোগ খোলা রাখতে চায়। চ্যাথাম হাউসের বাজপেয়ির মতে, একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি ভবিষ্যতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ, ভারত-মার্কিন সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়লেও কৌশলগত সম্পর্কের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। বরং বাণিজ্যচুক্তি, পাকিস্তান ইস্যু, সন্ত্রাসবাদ ও অভিবাসননীতির মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের অবস্থান কতটা সমন্বিত হয়, তার ওপর আগামী দিনের সম্পর্কের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।
সূত্র: আল-জাজিরা