ভারতের সংসদ ভবনে সাধারণত গম্ভীর আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক শোনা যায়। কিন্তু সম্প্রতি সেখানে শোনা গেল এক ভিন্ন সুর—‘দেলুলু’, ‘ফোমো’, ‘ক্লক ইট’-এর মতো ‘জেন জি’ প্রজন্মের ব্যবহৃত ইন্টারনেট স্ল্যাং! শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের সাম্প্রতিক এক বড়সড় আন্দোলনের পরই যেন আচমকা তরুণদের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন দেশটির রাজনীতিকরা।
কী ঘটেছিল সংসদে?
‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে পরীক্ষা ফাঁসের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের পর একটি নতুন বিল নিয়ে বিতর্ক চলছিল লোকসভায়। আর সেখানেই দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য:
• শ্রীকান্ত শিন্ডে (শিবসেনা): বিরোধী দলকে কটাক্ষ করে বলেন তারা ‘ফোমো’ বা কিছু হারানোর ভয়ে ভুগছে এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘দেলুলু’ হয়ে গেছে।
•বাঁশুরি স্বরাজ (বিজেপি): নতুন পরীক্ষা ফাঁস বিরোধী বিল আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘ক্লকড ইট’ বা ‘সঠিক সমাধান বের করেছেন’ বলে প্রশংসা করেন।
•দীপেন্দর সিং হুডা (কংগ্রেস): সরকারকে ব্যঙ্গ করতে ভাইরাল মিম স্লোগান ‘ওয়েস্ট-গুনা-হুইয়া’ ব্যবহার করেন।
এমনকি এই অদ্ভুত মুহূর্ত দেখে বিরোধীদলীয় নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে অবাক হয়ে প্রশ্নও তোলেন, ‘আমরা কেন জেন জি-দের ভাষায় কথা বলছি?’

ভাষার রাজনীতি বনাম বাস্তবতা
মিম, রিল আর ভ্লগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা তরুণদের এই ডিজিটাল আন্দোলন সরকারকে যেমন চাপে ফেলেছিল, তেমনি ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন এক রাজনৈতিক ভাষারও জন্ম দিয়েছিল।
সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাহুল ভার্মার মতে, রাজনীতিকরা সবসময়ই ভোটারদের মন জয় করতে জনপ্রিয় সংস্কৃতির (যেমন ক্রিকেট বা সিনেমা) ভাষা ধার করেন। এটি তারই নতুন একটি রূপ। তবে ডিজিটাল নৃবিজ্ঞানী পায়েল অরোরা মনে করেন, নতুন প্রজন্মের শব্দভাণ্ডার ধার করা যতটা সহজ, তাদের মূল হতাশা বা সমস্যার সমাধান করা ততটাই কঠিন। এটি কেবল একটি ‘সাংস্কৃতিক সচেতনতার’ ভান হতে পারে, প্রকৃত রাজনৈতিক রূপান্তর নয়।
তরুণদের প্রতিক্রিয়া: বিরক্তিকর!
রাজনীতিকদের মুখে নিজেদের ভাষা শুনে মোটেও খুশি নন আন্দোলনকারী তরুণরা। কারণ একদিকে সরকার তাদের ভাষা অনুকরণ করছে, অন্যদিকে বিক্ষোভে জড়িত ছাত্র ও কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিজেপির এক আন্দোলনকারীর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘অর্থপূর্ণ পরিবর্তন ছাড়া আমাদের ভাষায় কথা বললে আমরা প্রভাবিত হব না। আমরা জবাবদিহিতা চাই, রাজনীতিকরা আমাদের অনুকরণ করুক তা চাই না। এটা খুবই বিরক্তিকর।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের আমাদের মতো করে কথা বলতে বলিনি, আমাদের কথা শুনতে বলেছি।’
তরুণ প্রজন্মের এই নতুন শব্দভাণ্ডার সংসদে টিকবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে, তবে জেন জি-রা যে কেবল কথায় নয়, জবাবদিহিতা ও কাজেও বিশ্বাসী—সেটি তারা স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি নিউজ