ব্যারিকেড ভাঙতে যাওয়া কিংবা পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ার অনেক আগেই গতকাল সোমবার দিল্লির যন্তর মন্তরে দেখা যায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক থেকে শুরু করে তরুণ পেশাজীবীরা সংসদ ভবন অভিমুখে আয়োজিত পদযাত্রায় যোগ দিতে সমবেত হয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে এদিন সকাল ৯টার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ পৌঁছে যান।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একপর্যায়ে তাদের ঘিরে ফেলে দিল্লি পুলিশ। যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার সবকটি পথ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রার অনুমতির জন্য যন্তর মন্তরের মঞ্চের কাছে পুলিশের সঙ্গে সিজেপির মূল কমিটির আলোচনা তখনও চলছিল।
তবে সেই অনুমতি আর মেলেনি।
আগের দিন রোববারই দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, যন্তর মন্তরে অবস্থান চালিয়ে যাওয়া কিংবা সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা করার কোনো অনুমতি সিজেপিকে দেওয়া হয়নি।
তবে পুলিশের এই কড়াকড়ি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষদের দমাতে পারেনি।
সোমবার যন্তর মন্তরে সবার আগে পৌঁছানো ব্যক্তিদের একজন দিল্লির শাহদারার বাসিন্দা দীপা। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি বিক্ষোভস্থলে পৌঁছান।
৪২ বছর বয়সী এই নারী দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমার দুটি সন্তান সরকারি স্কুলে ১০ম ও ১২তম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের ভবিষ্যৎও এখন ঝুঁকিতে।
‘আমরা শিক্ষাব্যবস্থার এমন পরিবর্তন চাই, যেখানে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব শিশু সমান সুযোগ ও সমান সম্পদ পাবে। তবেই না পরিবর্তন সম্ভব।’
দীপার স্বামী প্রহ্লাদ (৪৬) বলেন, ‘পুলিশের অনুমতির জন্য আমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও রাজি আছি। ভয় পেলে কি আর আমরা এখানে আসতাম?’
দীপা ও প্রহ্লাদের বড় ছেলে আইআইটি-জেইই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে জানায়, তার বড় বোন যন্তর মন্তরে চলমান বিক্ষোভে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে। তার কাছ থেকেই তারা জানতে পারে, প্রতি রাতে কীভাবে সেখানে ভিড় বাড়ছে।
পাশেই অপেক্ষা করছিলেন সকালে পরিচিত হওয়া তিন ব্যক্তি। মুম্বাইয়ের এক অভিনেতা এবং জয়পুর ও দিল্লির দুজন স্থপতি। তারা পদযাত্রা শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন।
মুম্বাইয়ের অভিনেতা ও শিক্ষক উজয় জানান, তিনি প্রথম ইনস্টাগ্রামে এই আন্দোলনের কথা জানতে পারেন।
‘প্রথমে বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি পরিষ্কার ছিলাম না। তবে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার পর বুঝলাম। তারা অবশ্য কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির পক্ষে নয়।
‘কিন্তু আমার মনে হয়, আপনার নাকের ডগায় যদি কিছু ঘটে থাকে, তাহলে তার দায়ভার নেওয়া ভালো চর্চা। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে,’ বলেন তিনি।
তবে যন্তর মন্তরে বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি দেখে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন উজয়।
তিনি বলেন, ‘এত মানুষের সমাগম দেখে সত্যি ভালো লাগছে। তবে এত নিরাপত্তাবেষ্টনী দেখে ভয়ও লাগছে। মানুষের সুরক্ষা দেওয়াই তো পুলিশের মূল দায়িত্ব।’
উজয়ের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা দিল্লির এক স্থপতি প্রশ্ন তোলেন, সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রায় পুলিশের অনুমতির প্রয়োজন হবে কেন?
তিনি বলেন, ‘যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি, তার কাছ থেকেই আন্দোলনের অনুমতি নিতে হবে কেন? প্রতিবাদ করা তো আমাদের মৌলিক অধিকার।’
জয়পুর থেকে আসা ৪০ বছর বয়সী স্থপতি দুষ্যন্ত তরুণ আন্দোলনকারীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রজন্ম যেসব প্রশ্ন তোলার সাহস দেখায়নি, তারা সেই প্রশ্নগুলো তুলেছে। আমাদের সাংবিধানিক অধিকার পালন করতে কেন অনুমতি নিতে হবে, তারা সেই প্রশ্ন তুলেছে। অনুমতি না পেলেও অন্তত আমাদের এখানে এসে উপস্থিতি জানান দেওয়া উচিত।’
পুলিশের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে দুষ্যন্ত বলেন, ‘পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে জেনে আমরা অনেকে এখানে এসেছি। কারণ গোটা ব্যবস্থা পচে গেছে জেনেও আমরা আর কতদিন চুপ করে বসে থাকব?’
উত্তরপ্রদেশের বেরিলি থেকে এসেছিলেন ১৯ বছর বয়সী ডেলিভারিকর্মী নিতিন ও অনিল। সঙ্গে ছিলেন তাদের সহকর্মী রঞ্জন।
সংসার চালাতে গিয়ে তাদের সবাইকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
রঞ্জন দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি কারণ নিট পরীক্ষার (মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ২০ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়।
‘আমরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। সারাদিন গাড়ি চালিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি পণ্য পৌঁছে দিই। তাই জীবন যে কতটা অনিশ্চিত আর একটি জীবনের মূল্য যে কতখানি, তা আমরা খুব ভালোভাবেই বুঝি।’