জার্মানির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ বুন্ডেসরাট এমন একটি বিল অনুমোদন করেছে, যার আওতায় প্রকাশ্যে ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার অস্বীকার করলে কারাদণ্ড হতে পারে। এমন সময় এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো, যখন বার্লিন এখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে ও ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন আরও জোরদার করছে।
শুক্রবার হেসে অঙ্গরাজ্য সরকারের উত্থাপিত প্রস্তাবটি বুন্ডেসরাট অনুমোদন দেয়। গ্রীষ্মকালীন বিরতির পর বিলটি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগে উত্থাপনের কথা রয়েছে। খসড়া আইন অনুযায়ী, কেউ প্রকাশ্যে ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার অস্বীকার করলে বা রাষ্ট্রটি বিলুপ্ত করার আহ্বান জানালে তাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
সমালোচকদের মতে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইসরায়েল এমন একটি বিশেষ আইনি সুরক্ষা পাবে, যা জার্মানি ফিলিস্তিনকে দেয় না। বার্লিন দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। একই সঙ্গে গাজায় গণহত্যা চলাকালেও ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে ও ইসরায়েলের বর্ণবাদী ব্যবস্থা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে দ্রুতগতির জাতিগত নির্মূল অভিযান সত্ত্বেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
এ ছাড়া, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে আয়োজিত বিক্ষোভ, সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছে জার্মানি।
গত বছরের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, জার্মান কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী আন্দোলনকে ধারাবাহিকভাবে দমন করছে। জাতিসংঘের চারজন বিশেষ প্রতিবেদক ও দুজন স্বাধীন আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘জার্মানি বৈধ ফিলিস্তিনপন্থী সংহতি কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত, শাস্তি প্রদান এবং দমন করছে।’
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা সম্পূর্ণ বৈধ কিছু দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করা, গাজায় চলমান গণহত্যার অবসান, ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্বের অবসান, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর নিশ্চয়তা, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া ও আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এদিকে, জার্মান পার্লামেন্টের গবেষণা বিভাগ সতর্ক করেছে যে, হেসে অঙ্গরাজ্যের প্রস্তাবিত এই আইন সম্ভবত দেশটির সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
মে মাসে করা এক মূল্যায়নে গবেষণা বিভাগটি বলেছে, আইনটি একটি নির্দিষ্ট মতামতের বিরুদ্ধে বিশেষ অধিকার সৃষ্টি করতে পারে ও এটি সংবিধানের মৌলিক আইনের পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা ও রাষ্ট্রটি বিলুপ্ত করার আহ্বান, উভয়ই সম্ভবত ব্যক্তিগত মূল্যবোধভিত্তিক মতামতের প্রকাশ।’
এতে আরও বলা হয়, নাৎসি প্রচারণার ক্ষেত্রে যে সীমিত সাংবিধানিক ব্যতিক্রম রয়েছে, সেটিকে ইসরায়েল-সংক্রান্ত বক্তব্যের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করা ‘যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করা কঠিন’ হবে। ‘যদি তা করা সম্ভব না হয়, তাহলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এই হস্তক্ষেপ সাংবিধানিকভাবে বৈধ বলে গণ্য হবে না।’
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। সংস্থাটি বলেছে, ‘ইহুদি জনগোষ্ঠীর জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই উদ্যোগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করছে।’
এদিকে, জার্মানির বামপন্থী দলের সংসদ সদস্য লুকে হোস প্রস্তাবটিকে ‘স্পষ্টতই অসাংবিধানিক’ ও প্রতীকী রাজনীতি বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে বরং দুর্বল করবে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই