কল্পনা করুন ২০১৪ সাল। আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফোর্বসের প্রচ্ছদে এক ৩০ বছর বয়সী তরুণী। সম্পদ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার। তার নাম এলিজাবেথ হোমস। পত্রিকা বলছে ‘নেক্সট স্টিভ জবস’ আর সিলিকন ভ্যালি বলছে, তার কোম্পানি ‘থেরানোস’ হবে নেক্সট ফেসবুক। ক্লিনটন থেকে শুরু করে মেটিস, কিসিঞ্জার, বড় বড় নাম তার বোর্ডে। বিনিয়োগকারীরা লাইন দিয়ে টাকা ঢালছে।
আর মাত্র কয়েক বছর পর, ২০১৮ সালে ওই একই মানুষটা অভিযুক্ত প্রতারক। সাড়ে চার বিলিয়ন হয়ে গেছে শূন্য। কোম্পানি ধুলো, আর জেলের সাজা ১১ বছর।
তিনি স্টিভ জবস হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জবস মিথ্যা বলতেন না, হোমস শুধু মিথ্যাই বলতেন।
উত্থানের গল্প
হোমস স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথেই ড্রপআউট হয়ে যান। কারণ, তিনি নিজেই বলতেন, ‘স্টিভ জবসও ড্রপ আউট ছিলেন।’
পরে ২০০৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ‘থেরাপি’ আর ‘ডায়াগনোসিস’ মিলিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন থেরানোস। তার দাবি ছিল অবিশ্বাস্য, একটিমাত্র ডিভাইস, যার নাম এডিসন, যা কিনা মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ ২০০-এরও বেশি রোগ ধরতে পারবে।
এই স্বপ্নটা বিক্রি করতে তার জুড়ি ছিল না। স্টিভ জবসের মতোই তিনিও কালো টার্টলনেক পরতেন, কথাও বলতেন জবসের মতো থেমে থেমে। গভীর গলা, স্থির চোখ, প্রতিটি কথায় কনভিকশন।
তিনি এমনভাবে কথা বলতেন যেন মনে হত এই নারী ব্যর্থ হতেই পারেন না। যে বিশ্বাস করেনি, সে বোকা।
কারা বিশ্বাস করেছিল?
ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ হলো হোমস শুধু সাধারণ মানুষকে না বড় বড় মহারথীদেরও বোকা বানিয়েছিলেন। রিগানের সেক্রেটারি অব স্টেট জর্জ শুল্টজ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিস। নোবেলজয়ী কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার, এরা সবাই ছিলেন হোমসের বোর্ডে।
কৌশলটা কী ছিল? হোমস কাউকেই প্রযুক্তির বিস্তারিত দেখাতেন না, বলতেন এটা ট্রেড সিক্রেট। কেউ প্রশ্ন করলে বলতেন, ‘আপনি কি অ্যাপলের কাছে আইফোনের সার্কিট ডিটেইলস চান?’ এই এক লাইনে থামিয়ে দিতেন সবাইকে।
একজন সাংবাদিক যা করলেন
২০১৫ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক জন ক্যারেইরু গোপনে অনুসন্ধান শুরু করেন। তাকে থেরানোসের সাবেক কর্মীরা নাম লুকিয়ে তথ্য দিতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত হয় এক বিস্ফোরক রিপোর্ট, 'এডিসন মেশিন আসলে শুধু কয়েকটি পরীক্ষাই করতে পারে, বাকি পরীক্ষাগুলো হয় সিমেনসের সাধারণ মেশিনে।'
২০১৬ সালে সিএমএস পরিদর্শনে গিয়ে দেখে যে, ল্যাব এতটাই অপ্রস্তুত যে সব সার্টিফিকেট বাতিল করে তারা। এ সময় ওয়ালগ্রিনও চুক্তি ভাঙে। ২০১৮ সালে এসইসি ও ডিওজে একসাথে মামলা করে। ১১ হাজারের বেশি রোগী রক্ত পরীক্ষার ভুল রিপোর্ট পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে হোমস দোষী সাব্যস্ত হন। তার ১১ বছর ৩ মাসের সাজা হয়। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত কর্পোরেট ফ্রড মামলাগুলোর একটি।
কীভাবে সম্ভব হয়েছিল
হোমসের সাফল্যের রহস্য লুকিয়ে আছে মানুষের মনোবিজ্ঞানে। তিনি তিনটি জিনিস অসাধারণভাবে ব্যবহার করেছিলেন।
হারিয়ে যাওয়ার ভয়: সিলিকন ভ্যালির কালচারে সবাই ভয় পায় যে, পরের বড় কোম্পানিটা মিস হয়ে গেলে? সেই ভয়েই সবাই বিনিয়োগ করেছে।
কর্তৃপক্ষের পক্ষপাত: জর্জ শুল্টজ বোর্ডে আছেন মানে নিশ্চয়ই ভালো, এই ধারণায় পরেরজন বিশ্বাস করেছেন। এভাবে বিশ্বাসের চেইন তৈরি হয়েছে।
ন্যারাটিভ পাওয়ার: একটি ভালো গল্প সবসময় ডেটার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। হোমস বলতেন, ‘আমার বাবার বন্ধু ক্যান্সারে মারা গেছেন, কারণ সময়মতো টেস্ট হয়নি।’ এই একটা গল্পই মানুষের যুক্তি বন্ধ করে দিত।
থেরানোস’ প্রমাণ করে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বিপদজনক মানুষ সে, যে একটা ভালো গল্প বলতে পারে, কিন্তু সত্যের পরোয়া করে না।