ভারতের পাঁচটি রাজ্যে চলছে বিধানসভা নির্বাচন। দেশটির ২০২৬ সালের নির্বাচনী আবহ এখন উত্তপ্ত। ভারতের সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় লোকসভা, রাজ্যসভা, বিধানসভা এবং বিধান পরিষদের ভূমিকা যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফল আগামী ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে বিধানসভা হলো একটি রাজ্যের আইন প্রণয়নকারী সর্বোচ্চ সংস্থা, যেখানে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা (বিধায়ক) সংশ্লিষ্ট রাজ্যের প্রশাসনিক ও আইনি রূপরেখা নির্ধারণ করেন। ভারতের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গসহ আসাম, কেরালা, পুদুচেরি এবং তামিলনাড়ু এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচন বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
এপ্রিলের শুরু থেকে শুরু হওয়া এই বিশাল নির্বাচনী কর্মযজ্ঞে পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচটি রাজ্যের ১৭ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। দীর্ঘ এই ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া শেষে আগামী ৪ মে এই পাঁচ রাজ্যের বিশাল ম্যান্ডেটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেন্দ্রে সরকার গঠনের লড়াইয়ে এই পাঁচ রাজ্যের ফলাফল বিজেপি এবং বিরোধী জোটের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আধিপত্য ধরে রাখতে বা পরিবর্তনের ডাক দিতে হলে বিধানসভার এই নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি, কারণ বিধানসভার শক্তিই পরোক্ষভাবে সংসদের উচ্চকক্ষ বা রাজ্যসভায় দলীয় শক্তি নির্ধারণ করে।
বিশেষ করে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালার মতো রাজ্যগুলোতে কার হাতে ক্ষমতার চাবিকাঠি যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ রচিত হবে।
সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের এই রায় কেবল রাজ্য সরকার গঠন নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ মেরুকরণ এবং জাতীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে।
প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জনগণ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে লোকসভার সদস্যদের নির্বাচন করেন। লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। রাজ্যসভা একটি স্থায়ী কক্ষ এবং প্রতি দুই বছর অন্তর এর এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর নেন। রাজ্যসভার সদস্যরা সাধারণত জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, বরং রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।
ভারতের প্রতিটি রাজ্যে বিধানসভা বা নিম্নকক্ষ থাকে এবং এর সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচটি অঞ্চলে যে ভোট চলছে তা মূলত বিধানসভা নির্বাচন।
ভারতের সব রাজ্যে বিধান পরিষদ নেই; বর্তমানে মাত্র ৬টি রাজ্যে এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর সদস্যরা স্থানীয় সংস্থা, বিধায়ক এবং রাজ্যপালের মনোনয়নের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।
৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভায় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার সর্বশেষ অবস্থা:
১. পশ্চিমবঙ্গ: ২৯৪টি আসনে ভোট গ্রহণ চলছে।
২. আসাম: ১২৬টি আসনে লড়াই হচ্ছে।
৩. কেরালা: ১৪০টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
৪. তামিলনাড়ু: ২৩৪টি আসনের ভোট এক দফায় ২৩ এপ্রিল সম্পন্ন হয়।
৫. পুদুচেরি (কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল): ৩০টি আসনে ভোট গ্রহণ হচ্ছে।
ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া এপ্রিলের শুরু থেকে চলে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত ফলাফল ৪ মে ২০২৬ তারিখে ঘোষণা করা হবে। এছাড়াও গোয়া, কর্ণাটক, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরায় কিছু আসনে উপ-নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের ‘সেমিফাইনাল’ হিসেবে কাজ করবে। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
বিজেপির জন্য শক্তি পরীক্ষা: পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু ও কেরালায় বিজেপি ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী নয়। এই রাজ্যগুলোতে আসন বাড়াতে পারলে কেন্দ্রে তাদের আধিপত্য আরও সুসংহত হবে।
বিরোধী জোটের টিকে থাকার লড়াই: পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার মতো রাজ্যগুলো বর্তমানে বিজেপি-বিরোধী দলগুলোর অধীনে। এই দুর্গগুলো রক্ষা করা বিরোধী জোটের জন্য ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে লড়াই করার শক্তি যোগাবে।
রাজ্যসভার নিয়ন্ত্রণ: যেহেতু রাজ্যসভার সাংসদরা বিধায়কদের দ্বারা নির্বাচিত হন, তাই বিধানসভায় যে দল বেশি আসন পাবে, ভবিষ্যতে সংসদের উচ্চকক্ষে (রাজ্যসভা) তাদের শক্তি ও বিল পাসের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
সব মিলিয়ে, ১৭ কোটি ৪০ লক্ষ ভোটারের এই রায় ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ মেরুকরণ নির্ধারণ করবে।