রয়টার্সের প্রতিবেদন
ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান; কিছু কূটনীতিক যাকে প্রায় ‘অসম্ভব’ মিশন হিসেবে দেখছেন। তাদের লক্ষ্য, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি মধ্যস্থতা করা, যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে গোলাগুলি এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সীমান্ত-সংলগ্ন অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই ঝুঁকি এড়াতে তাই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুদ্ধ থামাতে কয়েক সপ্তাহ ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আলোচনা উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানী ইসলামাবাদের একাংশ কার্যত লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এরই মধ্যে সেখানে পৌঁছেছেন এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল শুক্রবার ইসলামাবাদে এসে পৌঁছাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শনিবার যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনার টেবিলে বসবে, তখন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আলোচনার মোড় দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির দিকে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের সিনিয়র রেসিডেন্ট ফেলো কামরান বোখারী বলেন, ‘চলমান যুদ্ধের ফলে ইরানে কোনো অরাজকতা সৃষ্টি হোক, পাকিস্তান তা চায় না। কারণ এটি পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের বিদ্যমান তীব্র নিরাপত্তা সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।’
পাকিস্তানের এই ভূমিকা দেশটির কূটনৈতিক ভাগ্যের এক নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ মাত্র এক বছর আগেও দেশটি কূটনৈতিক ময়দানে প্রায় কোণঠাসা অবস্থায় ছিল।
শনিবারের এই সংলাপে সফলতা এলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের নতুন এই গুরুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হবে। অন্যদিকে ব্যর্থতা দেশটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘পাকিস্তান এই মধ্যস্থতার পেছনে তাদের রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। যদি এই আলোচনা ভেস্তে যায়, তাহলে পাকিস্তানের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং ধারণা তৈরি হবে, দেশটি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি।’
নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা
শান্তি আলোচনার কেন্দ্রস্থল বিলাসবহুল সেরেনা হোটেল ও এর আশপাশের এলাকাকে কার্যত দুর্গের মতো সুরক্ষিত করে তুলেছে ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এখানেই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে হোটেলটি থেকে সব অতিথিকে সরিয়ে দিয়ে বর্তমানে এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে এবং হোটেলের দিকে যাওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পুরো শহরজুড়ে চেকপোস্ট, ব্যারিকেড ও টহল জোরদার করার পাশাপাশি অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এই ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি স্পষ্ট করে, পাকিস্তান কতটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশটি কেবল অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা নিয়েই চিন্তিত নয়, বরং যেকোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে লাইনচ্যুত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে মরিয়া।
নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থাগুলো যেকোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সফরের সাধারণ প্রটোকলকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এর অংশ হিসেবে আকাশপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং জরুরি সেবা সংস্থাগুলোকে সর্বদা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদিও পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলোতে বর্তমানে বড় ধরনের হামলা বিরল, তবে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে সীমান্ত অঞ্চলে সশস্ত্র তৎপরতা বেড়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদে এক আত্মঘাতী হামলা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই হামলার সূত্র ধরে পাকিস্তান কয়েকদিন পর আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালায়, যার ফলে দীর্ঘদিনের এই ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে।
স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলেন, ‘ঝুঁকির মাত্রা, প্রস্তুতির স্বল্প সময় ও শান্তি আলোচনার গুরুত্ব বিবেচনা করলে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এক সফর। এটি প্রমাণ করে, বর্তমান প্রশাসন এই আলোচনাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাহিদ হোসেনের মতে, পাকিস্তানের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু সভাস্থল রক্ষা করা নয়, বরং আলোচনার বাইরের অপশক্তিগুলো যেন এই কূটনীতিকে নস্যাৎ করতে না পারে সেদিকে নজর রাখা।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যেকোনো ধরনের নতুন উত্তেজনা এই অর্থবহ আলোচনার সুযোগ দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।’