ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন
ইরানের ৬ হাজার বছরের সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই হুমকির কিছুক্ষণ পরই তেহরানের রাস্তায় নেমে আসে মানুষের ঢল। তবে তাদের হাতে ছিল না কোনো সাদা পতাকা (আত্মসমর্পণের প্রতীক); বরং তারা উড়িয়েছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবুজ-সাদা-লাল পতাকা।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, তারা যে পরাশক্তিকে ‘নতজানু’ করেছে, তাদের সেই তারকাখচিত (যুক্তরাষ্ট্রের) পতাকায় আগুন দিতেও দেখা যায় অনেক ইরানিকে।
ট্রাম্পের দেওয়া সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, তার পরিণতি যা-ই হোক না কেন—সেটি স্থায়ী শান্তি আনুক কিংবা ইসরায়েল থেকে আজারবাইজান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া সেই সহিংসতায় আবার ফিরে যাক—শত্রুতার এই সাময়িক বিরতি কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার দাবি করা সেই ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে’র মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি।
ক্লান্ত ইরানিরা হয়তো বিমান হামলা থেকে দুই সপ্তাহের জন্য কিছুটা স্বস্তি পাবে, কিন্তু ট্রাম্পের যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো এখনো অপূর্ণই রয়ে গেছে এবং অনেক জটিল সংকটের কোনো সমাধান মেলেনি।
উভয় পক্ষই এখন নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করছে। তবে প্রকৃতপক্ষে কেউই এককভাবে জয়ী হতে পারেনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করার সময় ট্রাম্পের দাবি ছিল, ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করা।
ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন, তাদের অভিযানের ফলে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।
সেই মাপকাঠিতে বিচার করলে প্রায় ছয় সপ্তাহের বোমাবর্ষণের পর অর্জিত ফলাফল ট্রাম্প শিবিরের জন্য কিছুটা হতাশাজনকই বলা চলে।
ইরান ক্ষতবিক্ষত ঠিকই, কিন্তু তারা ভেঙে পড়েনি। দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা ধসে পড়া তো দূরে থাক, বরং আরও কঠোর হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) হাতে এখনো হামলা করার মতো অস্ত্র মজুত রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরও আইআরজিসি ইসরায়েল ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এতে ইসরায়েলের বের্শেবা এলাকায় দুই কিশোর আহত হয়।
এছাড়া ইরানের কোথাও না কোথাও এখনো কয়েকশ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহনে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং এর ফলে তেলের ক্রমবর্ধমান আকাশচুম্বী দাম নিয়ে ট্রাম্পের হতাশা স্পষ্ট। বিশেষ করে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কায় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো কঠোর এবং ধ্বংসাত্মক ভাষা ব্যবহার শুরু করেছিলেন।
অন্যদিকে, ইরানের বিপর্যস্ত নেতারাও তাদের পূর্বদাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধের স্থায়ী কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই কিছু তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছেন।
মঙ্গলবারের এই নাটকীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সংকটের চূড়ান্ত সমাধান মনে করার চেয়ে বরং সব পক্ষের জন্য সাময়িক বিশ্রামস্থল মনে হচ্ছে।
তবে ১৪ দিনের মধ্যে কোনো অর্থবহ আলোচনা না হলে কেবল ক্লান্তির দোহাই দিয়ে এই সহিংসতাকে থামিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
লন্ডনের গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমার মনে হচ্ছে, কোনো অর্থবহ সমাধানের চেয়ে পুনরায় যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যুদ্ধবিরতি কেবল শ্বাস নেওয়ার সুযোগ মাত্র। সব পক্ষই বিষয়টিকে কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখছে। কারণ সব পক্ষই নিজ নিজ দাবিতে অত্যন্ত অনড় অবস্থানে রয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব বিষয়ে কোনো সমঝোতায় আসা আসলেই কঠিন।’