দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিদেশে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেন, তখন তার হিসাব থাকে এমন—খুব কম মার্কিনির প্রাণহানি; যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর যতটা সম্ভব কম প্রভাব। এভাবেই সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে চান তিনি।
কিন্তু ইরানে যুদ্ধের শুরুর দিনগুলো সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এরই মধ্যে ছয়জন আমেরিকান নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় মিত্ররা হামলার শিকার হচ্ছেন। শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। গ্যাসের দাম বাড়ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রতিদিন কয়েকশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।
ইরানের স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, তারা তদন্ত করছে, এর জন্য কারা দায়ী।
যদিও এখন পর্যন্ত ইরানি ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন স্থলসেনা পাঠানো হয়নি, তবে প্রশাসন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার (৪ মার্চ) ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সংঘাত সংক্ষিপ্ত না-ও হতে পারে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা গতি বাড়াচ্ছি, কমাচ্ছি না। আজই আরও বেশি বোমারু বিমান এবং যুদ্ধবিমান এসে পৌঁছাচ্ছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ট্রাম্প তার প্রশাসনের দৃষ্টিতে একের পর এক দ্রুত সামরিক অর্জনে উৎসাহিত হয়েছিলেন।
ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্রুত অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে; ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আকস্মিক হামলা চালায়; ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তু করে; ক্যারিবিয়ান সাগরে একের পর এক সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকা উড়িয়ে দেয় এবং ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ অভিযানের অংশ হিসেবে ইরাক, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ায় লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালায়।
প্রশাসনের মতে, এই সবকটি অপারেশন দ্রুত এবং সফলভাবে সম্পন্ন হয়; যেখানে আমেরিকানদের জীবন বা সম্পদের ক্ষতি ছিল সামান্য।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা এই 'দ্রুত আঘাত' অপারেশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রশাসন যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিষয়ে আরও জড়িয়ে পড়ে।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে কাজ করা সাবেক আর্মি রেঞ্জার জেসন ক্রো বুধবার সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সেই একই অন্তহীন যুদ্ধের পথে হাঁটছে, যা তিনি নিজে দেখেছেন এবং যার বিরুদ্ধে ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন।
ক্রো বলেন, ‘ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়, হাজার হাজার আমেরিকানের জীবনহানি, দশকের পর দশক অন্তহীন সংঘাত—আমার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এবং এক শতাব্দীর এক চতুর্থাংশজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দেখার পর, আমরা আবারও সেই একই পথে যাচ্ছি।’
তিনি যোগ করেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, আমেরিকানরা এটাই চেয়েছিল এবং এখনও চায়। অথচ আমরা আবারও যুদ্ধে জড়াচ্ছি।’
ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের দেশ 'দখল' বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন, কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে সমর্থন দেননি।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবার জানিয়েছেন, হামলা শুরু করার পর থেকে ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, কিন্তু ইরানি সরকারকে উৎখাত করার জন্য তাদের অস্ত্র দেওয়ার কোনো পরিকল্পনায় রাজি হননি।
কেটো ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক গবেষক জন হফম্যান বলেন, ‘ট্রাম্প এমন একজন ব্যক্তি. যিনি কম খরচে জমকালো বিজয় পছন্দ করেন। প্রশাসনের লোকজনের কাছ থেকে আমি যা শুনছি তা হলো—মাদুরোকে ধরার পর তিনি বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। তিনি অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে অপরাজেয় মনে করছিলেন। কিন্তু এটা ভেনেজুয়েলার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। খরচ এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে।’
নিহত মার্কিন সেনাসদস্য এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে হফম্যান বলেন, ‘আমার মনে হয়, ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এটি আরও খারাপের দিকে যাবে। এই দাম বাড়তেই থাকবে।’
অবশ্য কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো এলিয়ট আব্রামস (যিনি ট্রাম্পসহ তিনজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করেছেন) মনে করেন, ইরানের নেতাদের হত্যা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার অনেক সুবিধা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত খরচ বলতে আমেরিকান সেনাসদস্যদের জীবনহানি। তবে এর সুবিধাগুলো বিশাল। ইরানের শাসনব্যবস্থা ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকানদের হত্যার চেষ্টা করছে এবং কখনো কখনো সফলও হয়েছে।’
আব্রামস বলেন, ট্রাম্প যদি স্থলসেনা পাঠাতে অস্বীকার করেন, তাহলে আমেরিকানদের মৃত্যুহার কম থাকতে পারে। কিন্তু একটি পঙ্গু হয়ে যাওয়া ইরানি শাসনব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত আমেরিকা এবং তার মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
তিনি বলেন, ‘যদি শাসনের অবশিষ্টাংশ ক্ষমতায় থেকেও যায়, তাহলেও তাদের কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি থাকবে না, কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থাকবে না এবং ওই অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের কোনো ক্ষমতা থাকবে না।’
কিন্তু হফম্যান এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। তিনি যুক্তি দেন, একটি অস্থিতিশীল ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনি বলেন, ‘যদি পরিকল্পনাটি হয় জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়া এবং ইরানকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করার চেষ্টা করা, তাহলে এটি এমন এক প্রক্সি যুদ্ধ হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র আগে কখনো করেনি। এটি ওই অঞ্চলে অবিশ্বাস্য মূল্য দিতে বাধ্য করবে।’
‘এমন পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ শরণার্থীর ঢল নামবে এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো গোষ্ঠীগুলোর পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে। এই গোষ্ঠীগুলো কেবল বিশৃঙ্খলার মধ্যেই টিকে থাকে। আপনি আসলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিচ্ছেন,’ যোগ করেন হফম্যান।