আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পঞ্চম দিনে গড়াতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ধর্মীয় যুদ্ধের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন মুসলিম অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) পেন্টাগনের বক্তব্যকে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘মুসলিমবিরোধী’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। এরপর থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে। জবাবে ইরানও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু এবং বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও সাইপ্রাসে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হেনেছে।
মার্কিন সেনাদের কী বলা হচ্ছে?
মার্কিন নজরদারি সংস্থা মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) জানিয়েছে, তারা সেনাসদস্যদের কাছ থেকে ই-মেইলে অভিযোগ পেয়েছে—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ‘বাইবেলের শেষ সময়’ বা ‘আর্মাগেডন’ ডেকে আনার পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নন-কমিশন্ড অফিসার অভিযোগ করেন, এক কমান্ডার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যেন তারা সৈন্যদের বলেন—এই যুদ্ধ ‘ঈশ্বরের মহাপরিকল্পনার অংশ’। তিনি বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে আর্মাগেডনের প্রসঙ্গ তোলেন এবং যিশু খ্রিস্টের আসন্ন প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই কমান্ডার দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যিশু অভিষিক্ত করেছেন, যাতে তিনি ইরানে ‘সংকেতের আগুন জ্বালিয়ে’ আর্মাগেডন সূচিত করতে পারেন।
প্রকাশ্য বক্তব্যেও ধর্মীয় ইঙ্গিত
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাইবেলে প্রতিশ্রুত ভূমি হওয়ায় ইসরায়েল চাইলে ‘মূলত পুরো মধ্যপ্রাচ্য’ দখল করলেও তা ঠিকই হবে—যদিও তিনি যোগ করেন, ইসরায়েল এমন কিছু করতে চাইছে না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘ইরান ধর্মান্ধ উন্মাদদের দ্বারা পরিচালিত দেশ’। একইভাবে পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ইরানের মতো ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইসলামি বিভ্রমে আচ্ছন্ন উন্মাদ শাসনব্যবস্থা পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না।’
কেয়ার তাদের বিবৃতিতে দাবি করে, হেগসেথের মন্তব্য শিয়া মুসলিমদের শেষ সময়সংক্রান্ত বিশ্বাসের প্রতি ইঙ্গিত করে করা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তোরাহর উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানকে বাইবেলের প্রাচীন শত্রু ‘আমালেক’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। ইহুদি ঐতিহ্যে ‘আমালেক’ শব্দটি ‘পরম অশুভ’-এর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
কেন ধর্মীয় যুদ্ধের কাঠামো?
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোলিয়ন মিচেলের মতে, সংঘাতকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করলে নেতারা ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে পদক্ষেপকে নৈতিক বৈধতা দেন, জনমত সংগঠিত করেন এবং রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এতে প্রতিপক্ষকে অমানবিক হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠা আরও কঠিন করে তোলে।
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুশারিফ বলেন, ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে সংঘাতকে ‘সভ্যতা বনাম উন্মাদনা’ কিংবা ‘সৎ বনাম অসৎ’-এর নৈতিক নাটকে রূপ দেওয়া হয়। এতে জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও আবেগঘন হয়ে ওঠে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে খ্রিস্টান জায়নিস্ট ধর্মযাজক জন হ্যাগি যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অগ্রসর হবে বলে দাবি করেন। এ ধরনের ভাষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ইভানজেলিক্যাল ও খ্রিস্টান জায়নিস্টদের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আগেও কি এমন হয়েছে?
ইসরায়েলের গাজা অভিযানের সময়ও নেতানিয়াহু ‘আমালেক’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সামরিক অভিযানে বাইবেলের ভাষা ব্যবহার করেছেন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে ‘ক্রুসেড’ বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তীকালে হোয়াইট হাউস জানায়, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ বোঝাতে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-সংঘাত মূলত ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই। তবে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করে এবং যুদ্ধকে নৈতিকতার চূড়ান্ত লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করে। এর ঝুঁকিও আছে—সংঘাত একবার ‘পবিত্র’ রূপ পেলে আপস বা কূটনৈতিক সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়ে।