অবশেষে মুক্তি। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মনীশ সিসোদিয়া আবগারি নীতি সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
আদালত জানিয়েছে, এই নীতি প্রণয়নে কোনো ষড়যন্ত্র বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছিল না।
ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এরও সমালোচনা করেছে আদালত এই কারণে যে, তারা অন্য সন্দেহভাজনদের দাবির ওপর ভিত্তি করে এই মামলা সাজানোর চেষ্টা করেছিল।
আদালতের বাইরে আজ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কেজরিওয়াল। ২০২৪ সালের মার্চে সেই গ্রেপ্তারের স্মৃতি মনে করে ক্যামেরার সামনেই কেঁদে ফেলেন।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সবসময় বলতাম, সত্য আমাদের সঙ্গেই আছে। একজন দায়িত্বরত মুখ্যমন্ত্রীকে তার বাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে জেলে ভরা হয়েছিল। আমাদের গায়ে কাদা ছিটানো হয়েছিল।’
অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তারের পর কয়েক মাস ধরে চলে চরম নাটকীয়তা।
এর মধ্যে ছিল চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এবং শাসকদল বিজেপির বিরুদ্ধে জেলে তাকে ইনসুলিন না দিয়ে 'মেরে ফেলার' চেষ্টার অভিযোগ।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট দ্বিতীয়বার হস্তক্ষেপ করে রায় দেয়, ‘দীর্ঘদিন আটকে রাখা ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্যায্য হরণ।’
এরপরেই তিনি জামিন পান।
জামিন পাওয়ার কয়েকদিন পরেই কেজরিওয়াল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন; যে পদটি তিনি কারাবন্দি অবস্থাতেও আঁকড়ে ধরে ছিলেন।
এর কারণ সম্পর্কে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এনডিটিভিকে জানিয়েছিল, এটি ছিল তার আদর্শগত লড়াই। জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে পদত্যাগ করার অর্থ হতো সেই অভিযোগগুলোকে মেনে নেওয়া।
কেজরিওয়ালের তখনকার জয় ছিল সাময়িক; আর আজকের এই জয় স্থায়ী।
২০২৫ সালের দিল্লি নির্বাচন
কেজরিওয়ালের আইনি লড়াইয়ের মাঝেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে যায়।
২০২৫ সালে দিল্লি নির্বাচনে বিজেপি অভাবনীয় জয় পায়। ৭০টি আসনের মধ্যে ৪৮টি জিতে প্রায় তিন দশক পর ভারতের রাজধানীতে ক্ষমতায় ফেরে দলটি। আর ১১ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কেজরিওয়াল ও তার দল বিদায় নেয়।
দলটির এই হারের মাত্রা ও গুরুত্ব ছিল অনস্বীকার্য। আবগারি নীতি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এবং কেজরিওয়ালকে 'কট্টর বেইমান' ও তার বাসভবনকে 'শীশমহল' বলে যে বিদ্রুপ করা হয়েছিল, তা এই পরাজয়ের বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়।
আপ, কেজরিওয়াল এবং সিসোদিয়া বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, একাধিক অভিযান ও তল্লাশি সত্ত্বেও কোনো অর্থ বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জনমানসে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সঞ্জয় সিং-সহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের ফলে পুরো নির্বাচনী প্রচারের সময় আম আদমি পার্টিকে কেবল আত্মপক্ষ সমর্থনেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল।
পরাজয়ের নেপথ্যে অন্যান্য কারণ
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পেছনে সরকারবিরোধী মনোভাব এবং জোটের সঙ্গী কংগ্রেসের সঙ্গে কোন্দলও দায়ী ছিল; যার ফলে আপ প্রায় ৭ শতাংশ ভোট হারায়।
তবে আবগারি নীতি বা মদ কেলেঙ্কারির মামলাটি ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা, কারণ এটি সরাসরি কেজরিওয়ালকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
আপ-এর রাজনৈতিক ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে কেজরিওয়ালের স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ওপর—যেখানে তাকে একজন কঠোর পরিশ্রমী, সৎ এবং মধ্যবিত্ত মানুষ হিসেবে দেখানো হয়।
এ ছাড়া কেজরিওয়ালের দীর্ঘ সময় কারাবাসের ফলে বিজেপি তার জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ পায়। এর মধ্যে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়ার সরকারি স্কুলের সংস্কার কার্যক্রমও ছিল।
কী ছিল এই আবগারি নীতি মামলা
২০২১ সালের নভেম্বরে কেজরিওয়াল সরকার নতুন এক আবগারি নীতি চালু করে। এর মাধ্যমে সরকার মদের খুচরা বিক্রয় থেকে সরে আসে এবং ব্যক্তিগত লাইসেন্সধারীদের দোকান চালানোর অনুমতি দেয়।
এর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, এতে মদের কালোবাজারি কমবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা উন্নত হবে।
নতুন নীতিতে মদের দোকানগুলো মধ্যরাতের পরেও খোলা রাখা এবং ছাড় দেওয়ার অনুমতি পায়।
এর ফলে মদের বিক্রি ব্যাপক বেড়ে যায় এবং রাজস্বে ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা জানায় সরকার।
কিন্তু দিল্লির তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এর সমালোচনা করে অভিযোগ তোলে, আম আদমি পার্টি আবাসিক এলাকায় মদের দোকান খোলার অনুমতি দিয়ে দিল্লিতে 'মদ সংস্কৃতি'র প্রসার ঘটাচ্ছে।
২০২২ সালের জুলাই মাসে দিল্লির তৎকালীন মুখ্য সচিব নরেশ কুমার এই নীতিতে 'গুরুতর অনিয়ম' খুঁজে পান।
অভিযোগ ওঠে, করোনা মহামারির সময় মদের লাইসেন্স ফি-তে শত শত কোটি টাকার অবৈধ ছাড় দেওয়া হয়।
এরপরেই ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এবং সিবিআই তদন্ত শুরু করে।
বিরোধী দলগুলো সেসময় অভিযোগ করে বলেছিল, বিজেপি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতেই এই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করছে।
চন্দ্রশেখর শ্রীনিবাসন এনডিটিভির জ্যেষ্ঠ সম্পাদক