ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে উৎসবের প্রস্তুতি চলছে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে। বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক শহর ডালাসে এবার ফুটবলের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে একটি দেয়ালচিত্র। প্রায় তিন দশক ধরে শহরের পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকা বিশাল এক তিমির চিত্রকর্ম মুছে ফেলার ঘটনায় ফিফা ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান শিল্পী রবার্ট ওয়াইল্যান্ড।
মামলায় ওয়াইল্যান্ড অভিযোগ করেছেন, তার বিখ্যাত ‘ওশান লাইফ’ বা ‘হোয়েলিং ওয়াল ৮২’ নামের দেয়ালচিত্রটি তার অনুমতি ছাড়াই রং করে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ডালাস শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রায় ১৭ হাজার বর্গফুটের এই শিল্পকর্মে জীবন্ত আকারের তিমি, ডলফিন ও সামুদ্রিক প্রাণীর ছবি আঁকা ছিল। ১৯৯৯ সালে নির্মিত দেয়ালচিত্রটি শুধু একটি শিল্পকর্মই ছিল না, বরং সমুদ্র সংরক্ষণ ও পরিবেশ সচেতনতার প্রতীক হিসেবেও পরিচিত ছিল।
শিল্পীর দাবি, বিশ্বকাপ উপলক্ষে নতুন দেয়ালচিত্র আঁকার জন্য পুরোনো কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভিজ্যুয়াল আর্টিস্টস রাইটস অ্যাক্ট বা ভারা আইনের অধীনে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এই আইন শিল্পীদের অনুমতি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম বিকৃতি বা ধ্বংসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
মজার বিষয় হলো, ফিফা সরাসরি এ ঘটনার দায় অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি বলছে, দেয়ালচিত্র মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত তাদের নয়। তবে মামলায় ফিফার পাশাপাশি স্থানীয় বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটি, ভবনের মালিক প্রতিষ্ঠান এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকেও আসামি করা হয়েছে।
ডালাস ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজক শহর। এখানে মোট নয়টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যার মধ্যে একটি সেমিফাইনালও রয়েছে। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন স্থানে নতুন শিল্পকর্ম ও সজ্জা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই তিমির দেয়ালচিত্রটি মুছে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ডালাসজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, শিল্পপ্রেমী এবং পরিবেশবাদীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, মাত্র কয়েক সপ্তাহের একটি ক্রীড়া আসরের জন্য শহরের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুছে ফেলার প্রয়োজন ছিল কি না। কয়েক হাজার মানুষ অনলাইন পিটিশনে স্বাক্ষর করে জনশিল্প সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
রবার্ট ওয়াইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তাঁর ‘হোয়েলিং ওয়াল’ সিরিজের জন্য পরিচিত। বিভিন্ন শহরে তিনি শতাধিক বৃহৎ দেয়ালচিত্র এঁকেছেন, যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্র ও সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা। ডালাসের দেয়ালচিত্রটিকে তিনি তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি বলে মনে করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে। ২০১৮ সালে নিউইয়র্কের একটি বিখ্যাত গ্রাফিতি কমপ্লেক্স ধ্বংসের ঘটনায় শিল্পীরা আদালতে জয়ী হয়েছিলেন এবং কয়েক মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। ফলে ওয়াইল্যান্ডের মামলাও শিল্পীদের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ফুটবল, তারকা খেলোয়াড় কিংবা স্টেডিয়াম। কিন্তু ডালাসে এবার বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে একটি তিমির ছবি। আর সেই ছবি ঘিরেই শুরু হয়েছে শিল্প, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং করপোরেট ক্ষমতার সংঘাতের নতুন অধ্যায়।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, নিউইয়র্ক পোস্ট।