সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। কিন্তু নিজেকে সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতে করতেন না কুণ্ঠাবোধ। তাও আবার যেনতেন পরিচয় নয়। সাবেক বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের অন্যতম সহযোগী লেফটেন্যান্ট কর্নেল আসাদুল ইসলাম হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসতেন নিজেকে। অদ্ভুতভাবে আসল ব্যক্তির সঙ্গেও মিলে যায় নিজের নাম। আর এই মিলে যাওয়া নামের ফাঁক দিয়েই চাঁদাবাজির রাজ্য খুলে বসার অভিযোগ উঠেছে আসাদের বিরুদ্ধে।
আসাদুল ইসলাম আসাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের কাছে চাঁদা দাবিসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তা আদায় করছেন। জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঢাকা-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম মানিকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তিনি। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরই ভোল পাল্টে বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে ফের চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র বলছে, আসাদুল ইসলাম আসাদ নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল পরিচয় দিলেও বাস্তবতা হলো, তিনি কোনোদিন সোনাবাহিনীতে কর্মরতই ছিলেন না। সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তারপর থেকেই নিজেকে সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। তিনি মূলত বিগত সরকার আমলের কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম মানিক ওরফে কাজী মানিকের অন্যতম সহযোগী হিসেবে ওই এলাকায় চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
কিন্তু প্রকৃত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আসাদ ছিলেন সাবেক বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের অন্যতম সোর্স। পাশাপাশি তিনি ছিলেন জিয়াউল আহসান এবং তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের অবৈধ অর্থ সংগ্রহের অন্যতম উৎস, অবৈধ সম্পদের রক্ষক এবং ব্যবসায়ীক অংশীদার।
সূত্র আরও বলছে, গত ১০ মার্চ জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে আসাদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাছরীন শামসের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজের আদালত এ আদেশ দেন।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, লে. কর্নেল পরিচয়দানকারী অপর আসাদটি কে? বিগত সরকারের সময়ের চাঁদা বাণিজ্য ও কাউন্সিলর মানিকের অন্যতম সহযোগী হয়েও সাবেক সেনা কর্মকর্তার পরিচয়ে তিনি কীভাবে প্রকাশ্যে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন?
সূত্রমতে, সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কাফরুল থানাধীন বেনারসি পল্লীর ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হোটেল রাব্বানীর মালিকসহ বেশকিছু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নতুন করে চাঁদা দাবি এবং তা আদায় করছেন আসাদ। এই চাঁদার টাকা আদায় করে তিনি ভারতে পলাতক সাবেক কাউন্সিলর কাজী মানিকের কাছে পাঠাচ্ছেন বলেও দাবি করছে সূত্র।
সূত্রটি আরও বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কাজী মানিকের ছত্রছায়ায় এই এলাকায় চাঁদাবাজি করতেন আসাদ। বর্তমানে আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই ভোল পাল্টে বিএনপির ছায়াতলে ফের পুরোনো চাঁদা বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছেন তিনি। সাবেক সেনা কর্মকর্তার পরিচয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়া এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির পতাকাতলে আশ্রয় নেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাবেক সেনা কর্মকর্তা আসাদুল ইসলাম আসাদ নিজ এলাকায় ‘কর্নেল আজাদ’ নামেও পরিচিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তার নাম আলোচনায় আসে। সে সময় জিয়াউল আহসানের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে আসাদুল ইসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
অনুসন্ধান বলছে, সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের স্ত্রীর নামে কোটি কোটি টাকার চেক লেনদেনের নথিতে আসাদুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে। এছাড়া তাদের যৌথ নামে স্বাক্ষরিত দলিলপত্রও রয়েছে। এই কালো টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আসাদুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
অন্যদিকে, সাবেক কাউন্সিলর কাজী মানিকের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী হামলার একাধিক খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। জাল দলিল তৈরি করে সাধারণ মানুষের জমি দখল এবং পরবর্তী সময়ে তা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও চাঁদাবাজি ও ফুটপাত দখল করে মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে এসেছে মানিকের ক্যাডার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এই ক্যাডার বাহিনী, জমি দখল ও জালিয়াতি সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য লে. কর্নেল পরিচয়দানকারী এই আসাদ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাউন্সিলর মানিক বর্তমানে ভারতে পলাতক থাকলেও তার নামে রাজধানীর পল্লবী এবং কাফরুল থানায় রয়েছে একাধিক মামলা।
এসব বিষয়ে জানতে ১ আগস্ট (শনিবার) দুপুর ২টা ১০ মিনিটের দিকে আসাদুল ইসলাম আসাদকে ফোন করা হলে তিনি লে. কর্নেল নন বলেই জানান নাগরিক প্রতিদিনের এই প্রতিবেদককে। সেইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম মানিক তার মামা।
মিরপুর-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ইলিয়াস মোল্লাতো আমাকে চিনেই না।’
তবে সাবেক বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেই জানান তিনি। ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ব্যবসা নেই, আমিতো বেকার মানুষ।’
কিন্তু সূত্র বলছে, গত ১৫ বছরের দেশে-বিদেশে তার ব্যবসার বিস্তার ও প্রসার ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন ব্যবসার কাজে।