বাস্তবতা যেমন শব্দের সৃষ্টি করে, তেমনি শব্দও বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায় বা বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ‘শব্দের রাজনীতি এবং রাজনীতির শব্দ’—এই শিরোনামটিই বলে দিচ্ছে যে, ভাষা কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এটি ক্ষমতা এবং আদর্শিক লড়াইয়ের একটি বড় অস্ত্র। স্বাধীনতার বদলে যখন বলা হয় আজাদী, তখন এই শব্দ আর শব্দ থাকে না, হয়ে ওঠে ভিন্ন অর্থবাহী একটি শব্দ যা সময়কে তুলে ধরে, তুলে ধরে মতাদর্শ। যাতে উচ্চারণকারী বা ব্যবহারীকে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী বাংলাদেশে শব্দচয়ন নিয়ে এই পার্থক্যটা বেশি করে চোখে পড়ছে। এই শব্দ-রাজনীতি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার গভীরে রয়েছে সমাজ ও রাজনীতির এক বিশাল রূপান্তর।
এই ‘শব্দ-রাজনীতি’ নিয়ে ব্যবহারকারী ও অডিয়েন্সের মনস্তত্বের বিস্তারিত বিশ্লেষণ—
১. শব্দগুলো কি সত্যিই নতুন?
‘ইনকিলাব’, ‘আজাদী’, ‘ইনসাফ’ বা ‘ফয়সালা’—এই শব্দগুলো বাংলা ভাষায় মোটেও নতুন নয়।
ইনকিলাব: নজরুল ইসলামের কবিতায় এই শব্দের ব্যবহার আমরা দেখেছি। এটি আরবি/ফারসি জাত শব্দ হলেও বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এর দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে।
আজাদী: ‘আজাদী’ মানে স্বাধীনতা। এটি আমাদের লোকজ গান এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই ব্যবহৃত।
ইনসাফ ও ফয়সালা: এই দুটি শব্দ আমাদের সাধারণ আদালত, বিচারব্যবস্থা এবং গ্রামীণ সালিশি বৈঠকে শত বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাহলে বিতর্ক কেন?
বিতর্কটি শব্দের অর্থ নিয়ে নয়, বরং শব্দের ‘উৎস’ এবং ‘ব্যবহারকারী’ নিয়ে। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা মনে করছে, এই শব্দগুলো বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম বা ইসলামী ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে ধার করা। তাদের মতে, ‘বিপ্লব’-এর বদলে ‘ইনকিলাব’ বা ‘ন্যায়বিচার’-এর বদলে ‘ইনসাফ’ ব্যবহারের প্রবণতা আসলে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বদলে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২. শব্দের রাজনীতি: ৫ আগস্টের পর যা বদলেছে
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তন করেনি, এটি বাংলাদেশের ভাষাগত বয়ানকেও (ন্যারেটিভ) পাল্টে দিয়েছে। কেন এই শব্দগুলো এখন এত বেশি শোনা যাচ্ছে?
প্রতিবাদের নতুন ভাষা: গত ১৫-১৬ বছর ধরে ‘জয় বাংলা’ বা ‘চেতনা’র মতো শব্দগুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। ফলে অভ্যুত্থানকারীরা এমন কিছু শব্দ বেছে নিয়েছে যা আগে ব্যবহৃত সেই ‘চেনা’ শব্দের বলয় থেকে মুক্ত। যার অর্থ আরো শক্তিশালীও।
সাংস্কৃতিক সংঘাত: বামপন্থি বা সেক্যুলার রাজনীতির বিপরীতে যখন এই শব্দগুলো ব্যবহার হয়, তখন বিরোধী পক্ষ একে ‘ইসলামীকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। আবার অন্যপক্ষ মনে করে, এটি আমাদের শেকড়ের এবং উপমহাদেশের ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার।
‘ফয়সালা হবে রাজপথে’—এই বাক্যটি যখন ব্যবহৃত হয়, তখন তা কেবল একটি কথা নয়, এটি একটি চূড়ান্ত যুদ্ধের হুঁশিয়ারি। এখানে ‘মীমাংসা’ শব্দের চেয়ে ‘ফয়সালা’ শব্দটি অনেক বেশি ধারালো, চাছাছোলা এবং শক্তিশালী মনে হয়।
৩. শব্দের বিবর্তন বনাম রাজনীতির বিকৃতি
আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের সমালোচনা মূলত ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়ের রাজনীতির অংশ। তারা এই শব্দগুলোকে ব্যবহার করে প্রমাণ করতে চায় যে, বাংলাদেশ এখন আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ পথে নেই, পথ হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে, যারা এই শব্দগুলো ব্যবহার করছেন, তারা বলছেন—ভাষা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দের সংমিশ্রণে। যারা সংকীর্ণ চিন্তার মানুষ, তারাই আজাদী, ইনকিলাব, ফয়সালার সমালোচনা করবে, করবে বিরোধীতাও।