বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী মনোভাব, অর্থনৈতিক খাতে দলীয়করণ, গণভোট বাতিলের উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজধানীর বংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে দলটির নেতারা বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দেশকে একটি অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, বর্তমান সরকার এমন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করছে, যা স্বৈরাচারের পথকে সুগম করে।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে লুটপাট ও অর্থ পাচারভিত্তিক অর্থনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সম্প্রতি কয়েকজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে যে বেসামরিক পরামর্শ কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা অর্থনীতিতে একচেটিয়া প্রভাব তৈরির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।’
অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যেমন প্রভাব বিস্তার করেছিল, এখন আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবসাকে দলীয়করণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এতে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নষ্ট হচ্ছে।’
সরোয়ার তুষার বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় বিএনপির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দলটি এমন এক আত্মঘাতী ও বেপরোয়া পথে হাঁটছে, যা রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। এখনো সময় আছে, জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিল না করে সেগুলোকে দ্রুত আইনে পরিণত করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে ফিরে আসতে হবে।’
অন্যদিকে, দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া বলেন, ‘সাম্প্রতিক যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে দলের সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে এবং শিগগিরই একটি অবস্থানপত্র (পজিশন পেপার) প্রকাশ করা হবে, যা সংশ্লিষ্ট মহল ও সংসদের স্পিকারের কাছে পাঠানো হবে। যেসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানো যায়, সেগুলো রাখা হচ্ছে; কিন্তু যেখানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে, সেগুলো বাতিল করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা আবারও দেখা যাচ্ছে। অতীতে যেসব বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছিল, এখন সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যেকোনো সময় অপসারণের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে চলে যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।’
গোপনীয়তা অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পূর্বে বহু সংস্থার কাছে বিনা অনুমতিতে ব্যক্তিগত যোগাযোগে নজরদারির ক্ষমতা ছিল, যা পরে সীমিত করে আদালতের অনুমতির বাধ্যবাধকতা আনা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে আবারও সেই অবাধ নজরদারির সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যা নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।’
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যারা সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং সংস্কারে ভূমিকা রেখেছিলেন, তারা এখন নীরব ভূমিকা পালন করছেন। জাতীয় দায়িত্ববোধ থেকে তাদের আবারও সক্রিয় হওয়া উচিত।’
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া বলেন, ‘দল শুরু থেকেই সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছার অভাবে সেই সহযোগিতা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোকে রাজপথে নামতে বাধ্য করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে পরিস্থিতি যেতে পারে, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিতর্কিত অধ্যাদেশগুলো পুনর্বিবেচনা করে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আইনে পরিণত করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে এসে সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করতে হবে।’