প্রয়াত প্রধান বিচারপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ভাষাসৈনিক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের রচনা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই উদ্ধৃতি তুলে ধরেন।
নিচে পাঠকদের জন্য হুবহু তা তুলে ধরা হলো।
“জেনে নিন, বাংলাভাষার জন্য যারা বুক পেতে গুলি নিতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৫২ সাল। সন্ধ্যায় নবাবপুর আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সভা। মাওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান অনুপস্থিত। শেখ মুজিবুর রহমান জেলে। উপস্থিত রয়েছেন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, যুবলীগের অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল মতিন। সভাপতিত্ব করছেন খেলাফতে রব্বানি পার্টির সভাপতি প্রবীণ আবুল হাশিম। ভোটাভুটি হলো, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কি, হবে না। ১১/৪ ভোটে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার প্রস্তাব জয়লাভ হলো।
সিদ্ধান্ত মানলেন না অলি আহাদ।
তিনি বললেন, ‘আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রসভা, সেই সভা যদি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে রায় দেয় , তবে আমরাও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে থাকব।’
আব্দুল মতিন বললেন, ‘একটা সিদ্ধান্ত না নিয়ে এই সভা সিদ্ধান্ত নিক যে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে এবং বিপক্ষে-দুটো মতই এসেছে। আগামীকালের ছাত্রসভায় দুটো মতই প্রকাশ করা হবে। এরপর ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিবে।’
আবুল হাশিম বললেন, ‘আগামীকাল শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে ছাত্র জনসভায় বক্তব্য দিবেন।’
পরের দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় আমতলায় ছাত্র জনসভা। সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটু আগেই ১০টায় শামসুল হক গেলেন মধুর ক্যান্টিনে। ছাত্র জনসভা ১ ঘন্টা পরেই। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উপস্থিত ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ঠিক হবে না। হঠাৎ একজন ছাত্র ‘ট্র্রেইটর’ বলে চিৎকার করে ধেয়ে আসলেন শামসুল হকের দিকে। শামসুল হক সাহেবের মাথার জিন্না টুপিটি ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেললেন দূরে, শূন্যে এবং বলতে লাগলেন, ‘You have no right to speak, get out.’
সেই ছাত্রটির নাম হাসান হাফিজুর রহমান।
রাত গভীর। ফজলুল হক হল পুকুরের সিঁড়িতে বুকে তীব্র আগুন নিয়ে বসে আছে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী, মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান, এম এ মোমিন, এস এ বারী, এম আর আখতার মুকুল, কমরুদ্দীন শহুদ, আনোয়ারুল হক খান, আনোয়ার হোসেন ও গাজীউল হক।
সূর্য উঠলেই ২১শে ফেব্রুয়ারি। সকলেরই একমত, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাই চলে গেল। শুধু বসে রইল গাজীউল হক এবং আব্দুল মোমিন।
মোমিনের পরামর্শে গ্রেপ্তার এড়াতে গাজীউল হক ভোরে নয়, রাতেই কলাভবনে চলে যাবেন। পুকুরের শীতল সিঁড়ির গায়ে শরীর এলিয়ে দিলেন গাজীউল হক, চেয়ে রইলেন আকাশ পানে। লক্ষ তারার অনন্ত আকাশ। আজ সব তারা যেন তাকে দেখছে স্তব্ধতার মাঝে। পুকুর পাড়ের নারকেল গাছ পেরিয়ে শীতল হাওয়া ঝাপটা দেয় তাঁর মুখে। কী হবে কাল! কেউ জানে না। শুধু সূর্য সন্তানই জানেন, ফেরার পথ নাই। সংগ্রাম চলবেই! মমিন বিদায় নিলেন।
গাজীউল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামের মধ্য দিয়ে একা চললেন কলাভবনের দিকে। মধুর ক্যান্টিনঘেঁষা প্রাচীর টপকালেন। দুটি ছিন্ন পোষ্টার বিছিয়ে তার ওপর শুয়ে পড়লেন। মনে পড়ছে বন্ধুর মুখ, মনে পড়ছে মায়ের মুখ, মনে পড়ছে বাংলা ভাষার সম্মান। ভাবনার মাঝে কখন যেন ঘুমিয়ে গেলেন ক্লান্ত শরীরের গাজীউল হক।
কাক ডাকার আগেই গাজীউল হকের ঘুম ভাঙ্গল। কলাভবনের বারান্দায় পায়চারি করলেন। চারদিকে কেউ নেই। বিশাল দেহটা কোনোরকমে ছোট চাঁদরে ঢেকে ছুটলেন মধুর ক্যান্টিনের দিকে।
ঘন কুয়াশা, প্রচন্ড ঠান্ডা! আলতো করে গেটটি ঠেলে কুয়াশা ভেদ করে কে যেন আসছে! কে? ওহ! মোহাম্মদ সুলতান! সঙ্গে এস এ বারী, আরো দু’জন। তোমরা এত সকালে এসেছ! কী করবা? মুহাম্মদ সুলতান কোনো কথা না বলে ছোট ছোট কাগজের টুকরায় লিখতে রইল- ‘ছোট ভাই বোনেরা, সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে হবে। তোমরা দু'জন দু'জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসো।’
কিছুক্ষণের মধ্যে যোগ হলো আরো কিছু ছাত্র। মেডিকেলের ছাত্র মঞ্জু, সাইকেল চালিয়ে আসল ছোট্ট মেয়ে জাহানারা লাইজু। তাদের হাতে চিরকুটগুলো পাঠিয়ে দিল পোগোজ স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজে। ক্ষুদে সংগ্রামী লাইজু চিরকুট নিয়ে সাইকেলে চেপে বলাকার মতো উড়ে চলল মেয়েদের স্কুল-কলেজে।
সকাল আটটার মধ্যেই পুলিশ ঘিরে ফেলল পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। একজন দুজন করে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। কলাভবনের আমতলায় হাজার হাজার ছাত্রজনতা। রোদ উঠেছে ঝলমলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে পূর্বঘোষিত ছাত্র-জনতার জনসভা। এম আর আখতার মুকুলের কণ্ঠে ঘোষণা এলো....সভার সভাপতিত্ব করবেন গাজীউল হক। সমর্থন করলেন, কমরুদ্দীন শহুদ।
প্রথমেই বক্তব্য রাখবেন তুখোড় বক্তা আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। হাসান হাফিজুর রহমান আজ সকালে যে তার টুপি খুলে গগনে নিক্ষেপ করেছিল, গালমন্দ করেছে, সবই তার মনে আছে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তবুও তাকে ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার পক্ষেই বক্তব্য রাখতে হবে। মাইক হাতে দাঁড়ালেন শামসুল হক। চারদিকে ছাত্রদের ‘না না না’ বলে চিৎকার!
শামসুল হক সাহেব তার অসাধারণ বাগ্মীতায় কঠোর সমালোচনা করলেন নাজিম উদ্দীন-নুরুল আমিন সরকারের। ক্ষুরধার বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি তিনি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসলেন, কিন্তু যেই তিনি বললেন, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে হবে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ঠিক হবে না-সমবেত সকলেই তাকে বিরোধিতা করে বক্তব্য শেষ করতে বাধ্য করলেন।
এবার বক্তব্য দেবেন বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির পক্ষে আব্দুল মতিন। চারদিকে মুখরিত মিছিল স্লোগানে পূর্ণ।
আব্দুল মতিন বললেন, ‘আজ ১৪৪ ধারা আমরা যদি ভঙ্গ না করি, ভবিষ্যতে কোনো আন্দোলনই আমরা আর করতে পারব না। দীর্ঘপথ পেরিয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। এখন পিছিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বলেন, ভাই বোনেরা, আমরা কি ১৪৪ ধারার ভয়ে পিছিয়ে যাব?’
চারিদিকে মুখরিত আওয়াজ গগন চৌচির করে স্ফুলিঙ্গের চিৎকার ভেসে এল, ‘না না না’, ‘পিছিয়ে যাব না’, ‘১৪৪ ধারা ভাঙ্গতেই হবে’।”