ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভারতে আছেন এবং তার ঘোষণাটিও এসেছে ভারতের দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে।
বাংলাদেশের আপত্তির পরও তার এই সংবাদ সম্মেলন ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এর পাঁচ দিন পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদিকে।
বৈঠকের পর সেদিনই তিনি উড়াল দেন দিল্লীর উদ্দেশে। দিল্লী পৌছে পরদিন তাকে আলোচনা করতে দেখা গেছে নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। বাংলাদেশে বৈঠক শেষে দিনেশ ত্রিবেদিকে ঠিক কী কারণে দিল্লী ছুটে যেতে হলো সেটা অবশ্য পরিষ্কার নয়।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে হঠাৎ এই যে একধরণের টানটান পরিস্থিতি তার পেছনে দিল্লীর প্রেস ব্রিফিংয়েরও যে একটা ভূমিকা আছে সেটা স্পষ্ট। কারণ ঐ ব্রিফিংয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন।
কিন্তু সেখানে ডিসেম্বরে ঢাকায় ফেরার যে ঘোষণা সেটা আসলে কতটা সম্ভব? কিংবা তিনি চাইলেই কি ফিরতে পারবেন এমন প্রশ্নও রয়েছে।
শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরা: স্বেচ্ছায় নাকি প্রত্যর্পণ
শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে, তার কাছে বৈধ কোন পাসপোর্ট নেই। বাংলাদেশ সরকার তার পাসপোর্ট বাতিল করেছে। ফলে পাসপোর্ট ছাড়া তিনি কীভাবে ফিরবেন সেটা একটা প্রশ্ন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন।
তবে তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয়ও সরাসরি সেভাবে বাধা নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরে তিনি সত্যিই দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন কীনা ও তখন বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরতে দেবে কীনা?
বাংলাদেশ অবশ্য শেখ হাসিনার বিষয়ে আগেই তার অবস্থান পরিস্কার করেছে। দেশটি শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চায়। কিন্তু তার ফেরার কী সুযোগ আছে?
এখানেও দুটি পথ স্পষ্ট। একটি হচ্ছে, তিনি নিজের সিদ্ধান্তে নিজের পছন্দমতো সময়ে ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেন। তবে এটার জন্য তার দরকার হবে বৈধ পাসপোর্ট। পাসপোর্ট না থাকলে উপায় হচ্ছে, ট্রাভেল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে সীমান্ত পার হওয়া।
সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) তো বাংলাদেশের নাগরিক। নিজ দেশে ফেরত আসতে চাইলে সেটা তার অধিকার। একইসঙ্গে পাসপোর্ট পাওয়াও তার অধিকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘তার যদি ভ্যালিড পাসপোর্ট থাকে, তিনি সেটা ব্যবহার করতে পারবেন। না থাকলে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে ট্রাভেল পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারবেন। সে আবেদনের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারের সিদ্ধান্ত যদি ইতিবাচক হয় তাহলে তিনি পারমিট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন।’
তবে শেষ পর্যন্ত যদি শেখ হাসিনা নিজে ফিরে না আসেন তাহলে আরেকটি উপায় হচ্ছে, তার প্রত্যর্পণ। অর্থাৎ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের মামলা'য় অভিযুক্ত বা ফেরার আসামি ও বন্দিদের একে অপরের কাছে হস্তান্তরের জন্য যে চুক্তি আছে সেই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া।
তবে চুক্তিতে নানা ফাঁক-ফোকড় আছে। ফলে চাইলেই যে সেই আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই, বাধ্যবাধকতাও নেই। এ ছাড়া বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের দুই বছর পরও যখন এই প্রক্রিয়ার কোন অগ্রগতি হয়নি, তখন সেটা অদূর ভবিষ্যতে আদৌ সম্ভব কীনা তা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
অতীতেও ভারত বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের সে দেশে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ পরে স্বেচ্ছায় ফিরে গেছেন, আবার কেউ কেউ এখনো অবস্থান করছেন। তবে শেখ হাসিনা যেখানে নিজেই ফিরতে চান, সেখানে প্রত্যর্পণ আইন প্রয়োগের প্রয়োজন দেখছেন না জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান।
এলিনা খান বলেন, ‘উনি কিন্তু অলরেডি ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানেই অবস্থান করছেন। এটাকে আমরা জেল কাস্টোডি মনে করছি না। এখানে উনি নিজেই প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা পোষণ করেছেন যে, উনি আসতে চান। বাংলাদেশ সরকারও বলছে, উনি আসুক, তাকে ফেরত পাঠানো হোক। তাহলে সেখানে ভারতের কোন চুক্তি বা এ ধরনের কোন সমস্যা আছে বলি মনে করছি না। কারণ শেখ হাসিনা যদি বলতেন যে, আমি যাবো না। তাহলে একটা প্রশ্ন আসতো যে, ঐ আইন অনুযায়ী তাকে পাঠানো হোক। কিন্তু উনিও আসতে চাচ্ছেন, এখানে সরকারও তাকে চাচ্ছে। সুতরাং উনার আসতে কোন বাধা আছে বলে আমি মনি করি না।’
শেখ হাসিনা ফিরলে কী হবে
এটা নির্ভর করছে, তিনি কীভাবে ফেরেন তার উপর। রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, তিনি যদি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ কোনো নেগোসিয়েশন’ করে আসতে পারেন, তাহলে তার ফেরাটা হবে একরকম।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় নেগোসিয়েশনের পরিস্থিতি সেভাবে দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে যদি নেগোসিয়েশন ছাড়াই তিনি ফেরেন, তাহলে সেক্ষেত্রে তাকে ফিরেই আত্মসমর্পণ করতে হবে অথবা গ্রেপ্তার হতে হবে কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইতোমধ্যেই তার মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে।
এলিনা খান বলেন, ‘আইন তো সবার জন্যই প্রযোজ্য। সুতরাং উনি আসা মাত্রই তো উনাকে গ্রেপ্তার করবে। এখানে আরেকটা বিষয় হচ্ছে, উনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার যে সময়সীমা সেটাও কিন্তু অলরেডি পার হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে তো উনাকে প্রথমেই আসলে কাস্টোডিতে নেবে। তারপর আইন অনুযায়ী পরের পদক্ষেপ চলতে থাকবে।’
দেশে ফিরলেই মৃত্যুদণ্ডের সাজার মুখোমুখি কিংবা গ্রেপ্তারের যে ঝুঁকি সেটা নিশ্চিতভাবে শেখ হাসিনাও জানেন। কিন্তু তাহলে তার আসার কথা কেন বলা হচ্ছে? এখানেই সামনে আসছে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব সংকটের কথা।
দলটির কার্যক্রম ইতোমধ্যেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা নিজেসহ অন্য নেতারাও পলাতক। ফলে দল বাঁচানোর জন্যই শেখ হাসিনা ফিরবেন এমন বক্তব্য আছে দলটির ভেতরে।
যদিও তার ফেরার বাস্তবতা দেখেন না রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে আমি আর ঐরকম হিরোইক জায়গাতে দেখতে পাই না। যেভাবে উনাকে চলে যেতে হলো, আমার মনে হয় না যে, ঐ সাহস নিয়ে উনি ফিরবেন এবং আত্মসমর্পণ করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘উনি যতো জোর গলায় বলছেন, আইনি পন্থায় এগুলোকে মোকাবেলা করার মতো বাস্তবতা তার নাই। আর বাংলাদেশেও বিচারকে আমরা এরকম পক্ষপাতহীন, প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার বাইরে এসে ন্যায়বিচার আমরা দেখি না। এখানে শেখ হাসিনা নিজেও ন্যায়বিচার করেন নাই। উনি ন্যায়বিচার পাবেন, এই ভরসাও উনার নাই। ফলে উনি এখানে আসবেন না।’
শেখ হাসিনা কি চাইলেই ফিরতে পারবেন
শেখ হাসিনার আসা না আসার বিষয়টি যে শুধু তার একার উপর নির্ভর করছে তা নয়। বাংলাদেশে যদি সত্যিই তিনি ফিরে আসতে পারেন তাহলে এরপর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে সেটার মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ইস্যুটির সঙ্গে এখন ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যতও জড়িয়ে গেছে।
শেখ হাসিনা চাইলেই যে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিরে আসতে পারবেন সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর সেটা মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘তিনি তো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কাজেই এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যাদের পেছনে লক্ষ মানুষের সমর্থন থাকে, বড় সংগঠন থাকে এবং যারা সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন বা ব্যাঘাত ঘটাতে পারেন, সেই ধরনের ব্যক্তিদের ব্যাপারে তো একক সিদ্ধান্তের বিষয় থাকে না। অনেক সময় এর সঙ্গে অন্যান্য অংশীদারেরা যুক্ত হয়ে যান।’
কিন্তু এখানেই তাহলে আবার প্রশ্ন উঠছে ভারত কি তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ হিসেবে শেখ হাসিনা ইস্যুকে ব্যবহার করছে? হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘ভারত যদি এটাকে তার দরকষাকষির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, সেটা আমার ধারণা ইতিবাচকের বদলে নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’
তিনি বলেন, ‘গত ৫ আগস্টে দিল্লীতে যে কাণ্ডটা (প্রেস ব্রিফিং) ঘটলো, তারপর আপনি রিঅ্যাকশনটা যদি খেয়াল করেন। এ রকম ভাষায় প্রতিবাদ আমি কখনো দেখিনি। কীরকম বিক্ষুব্ধ হলে এমন প্রতিবাদের ভাষা আসতে পারে। এটা তো সরকারি পর্যায়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যারা আছেন, তারাও কিন্তু সরব প্রতিবাদ করেছেন।
এম হুমায়ুন কবীর আরও বলেন, ‘এখানে ভারত দরকষাকষি করেছে সেটা বলবো না। (শেখ হাসিনাকে ব্রিফিং করার) একটা সুযোগ হয়তো করে দিয়েছে। কিন্তু এ সুযোগ করে দেয়ার রিঅ্যাকশনটা আপনি পেয়েছেন। কাজেই এটা কিন্তু একটা ইন্ডিকেটর এটা বোঝার জন্য যে, ফারদার এটা নিয়ে মুভ করতে গেলে কীরকম রিঅ্যাকশন হতে পারে।’
শেখ হাসিনা শেষপর্যন্ত কী করবেন সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে তার সমীকরণ যেমনটাই হোক, এটা স্পষ্ট যে, ফেরার সময়সীমা ঘোষণার সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার জন্য নতুন করে একটা রাজনৈতিক ঝুঁকিও বটে। বিশেষ করে ঘোষণা দিয়ে দেওয়ার পর তিনি যদি না ফেরেন, তাহলে সেটা দলকে পুনরুজ্জীবিত করা তো দূরের কথা বরং সেটা নতুন সংকটের কারণও হতে পারে।