চাকরির নিয়োগপত্র, কারখানার আইডি কার্ড ও বেতন স্লিপ, এই তিন কাগজই এখন শ্রমিকের অধিকার আদায়ের প্রধান হাতিয়ার। অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলে শ্রমিকদের জয় নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অবৈধ ছাঁটাই, বকেয়া মজুরি, ওভারটাইম, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, গ্র্যাচুইটি বা প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে বঞ্চিত হলে শ্রমিকরা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), লিগ্যাল এইড অথবা শ্রম আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
ডিআইএফই’র তথ্য অনুযায়ী, সালিশে ওঠা অভিযোগের প্রায় ৮০ শতাংশেই শ্রমিকরা সফল হন। অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রম আদালতে হওয়া মামলার প্রায় ৭৫ শতাংশ রায় শ্রমিকদের পক্ষে যায়।
বর্তমানে শ্রমিকদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দেশে ১৩টি শ্রম আদালত ও একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ৩৩১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের ও বর্তমান মিলিয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৭ হাজার ৮৭৬টি।
জাতীয় আইনি সহায়তা প্রদান সংস্থার (লিগ্যাল এইড) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩০ হাজার ৪১ শ্রমিককে সরকারি খরচে আইনি সেবা দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য ছয় কোটি ৯৭ লাখ ১১ হাজার ৯১৬ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে শ্রমিক আইনি সহায়তা সেলের মাধ্যমে ২২ হাজার ৮৩টি আইনি পরামর্শ সেবা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চার হাজার ৬১৭টি মামলায় আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৮২০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগেই শ্রমিকরা জয়ী হয়েছেন।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘শ্রমিকরা বিভিন্নভাবে অভিযোগ করতে পারেন। কোথাও মালিকপক্ষ আইন না মানলে মহাপরিদর্শক, পরিদর্শক বা টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ নম্বরে অভিযোগ জানানো পারেন। বছরে প্রায় পাঁচ হাজার অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ হচ্ছে তথ্য জানার জন্য যা অধিদপ্তরের এখতিয়ারভুক্ত নয়। বাকি ৮০ শতাংশ অভিযোগ সঠিক পাওয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তা সংশ্লিষ্ট অফিসে পাঠিয়ে দিই। পরিদর্শকরা তদন্ত করে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে শ্রমিকের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এভাবে প্রায় ৮০ শতাংশ অভিযোগে শ্রমিকরা প্রতিকার পান। যেসব ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ পরিদর্শকের কথা শুনেও পাওনা দেয় না, সেসব ক্ষেত্রে আমাদের পরিদর্শকরা মামলা করেন। অনেক সময় শ্রমিক নিজেও বাদী হয়ে মামলা করেন।’
লেবার কোর্ট লইয়ার্স সোসাইটির (বার অ্যাসোসিয়েশন) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ এস এম আনিছুজ্জামান তুহিন বলেন, ‘কারখানা, দোকান, নির্মাণ সাইট, হোটেল কিংবা বাসায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করলে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলে শ্রম আইন ২০০৬-এর অধীনে যে কেউ মামলা করতে পারে। তবে জেতার জন্য শর্ত একটাই, আপনি যে শ্রমিক তার কাগজপত্র থাকতে হবে। শ্রম আইনে দায়ের হওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ মামলার রায় শ্রমিকদের পক্ষে যায়। ১০ শতাংশ মামলায় কাগজপত্র সঠিক পাওয়া যায় না। বাকি ১৫ শতাংশ মামলায় মালিকপক্ষ জয়ী হয়।’
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার হেদায়েতুল ইসলাম জানান, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ৩৩১টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের ও বর্তমান মিলিয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৭ হাজার ৮৭৬টি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাকরিতে যোগ দেওয়ার দিনই নিয়োগপত্রের ছবি তুলে রাখা, আইডি কার্ডের ফটোকপি সংরক্ষণ ও প্রতি মাসে বেতন স্লিপ নেওয়া জরুরি। সমস্যা হলে ডিআইএফই-এর হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ অথবা লিগ্যাল এইডের হটলাইন ১৬৪৩০ নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।