ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশজুড়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকার ধর্ষণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে সম্প্রতি দেশব্যাপী ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও আগের সরকারি পদক্ষেপের মতোই কাগজকলমে থাকবে নাকি কার্যকর হবে তা নিয়ে এখনো রয়েছে ধোঁয়াশা।
গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সুয়োমোটো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সময় বলা হয়েছে যে, ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলোর একটি। এই ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ সেই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নেরই অংশ।
এ লক্ষ্যে চলমান ও পূর্বের সব মামলার নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে বলা হয় ধর্ষণ মামলায় একাধিক সংস্থা জড়িত থাকায় তাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি এই অপরাধ রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি জেলায় বিদ্যমান বিশেষ আদালতগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। ঈদকালীন ছুটির মধ্যেও এই সংক্রান্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের স্থবিরতা না আসে।
কীভাবে বাস্তবায়ন হবে ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই বিশেষ উদ্যোগের আওতায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ কমিয়ে আনা, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ দ্রুত করা ও মামলাগুলোর নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রসিকিউশন ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এ ছাড়া ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মামলা পরিচালনায় কোনো ধরনের গাফিলতি হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বাস্তবায়নের কাঠামো শক্তিশালী করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বাস্তবতায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, বিচারাধীন মামলার উচ্চ জট, তদন্তের মান ও সময়সীমা এবং সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তার কারণে অপ্রকাশিত ঘটনা যা এই বিচার প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি প্রভাবিত করতে পারে।
তারা বলছেন, সরকারের এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন, জবাবদিহিতা ও কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশে নারী নির্যাতন দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ বিশ্লেষক শীপা হাফিজা বলেন, ‘মামলার দীর্ঘসুত্রিতা ও ব্যয় এবং মামলা চলাকালে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা সুবিচার প্রতিষ্ঠায় মূল অন্তরায়। তাই আগে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ট্রাইব্যুনালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন হলে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন জরুরি। তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। আবার ডিএনএ পরীক্ষা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত ল্যাব ও জনবল প্রয়োজন। তাই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন বাধ্যতামূলক করা হলে গতি বাড়তে পারে।’
একই সময় তিনি তদন্ত কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি প্রমাণিত হলে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও সংযোজনের আহ্বান জানান।
ব্যরিস্টার জ্যোত্যির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘গত নির্বাচনের পর হটাৎ করেই ধর্ষনের মতো ঘটনা বেড়ে গেছে। যেখানে সরকারদলীয় এবং বিরোধীদলের নেতা কর্মীদের নামও আসছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, অতীতে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের জন্য একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠতে না পারা, জনবল সংকট, মামলার জট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে।’
তবে এবার যদি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বাস্তবিক অর্থে কার্যকর হয়, রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থানকে তোয়াক্কা না করে সব অপরাধীকে তাৎক্ষণিক আইনের আওতায় আনা হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতেই পারে। অন্যথায় সবই কাগুজে বাঘ হয়েই থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।