ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে দেশবাসীর মনে। এমন এক সময় এ অধিবেশন শুরু হচ্ছে, যখন সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দেশের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও জনমতের চাপও তুলনামূলক বেশি থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের প্রশ্নটিও এখন রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংসদ আগের অনেক সংসদের তুলনায় ভিন্ন চরিত্রের হতে পারে। দীর্ঘদিন পর সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধীদলের উপস্থিতিও এবারের সংসদের কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও তাদের জোটসঙ্গীরা বিরোধীদলের ভূমিকায় সংসদে আসায় সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি হবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে। ফলে এই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও বর্তায়। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন ও তার কার্যক্রম নিয়ে প্রথম অধিবেশনেই আলোচনা তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সংসদের প্রথম দিনই নতুন স্পিকার নির্বাচন করা হবে। একই সঙ্গে সংসদ উপনেতা ও ডেপুটি স্পিকারের নামও জানা যেতে পারে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎও এই অধিবেশনে নির্ধারিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করতে হবে; তা না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
সংসদ সচিবালয়ের সূত্রে জানা গেছে, অধিবেশন সকাল ১১টায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণও থাকার কথা রয়েছে, যা নিয়েও বিরোধীদলের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যাচ্ছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, সংবিধান মেনেই যেহেতু সরকার গঠন ও অন্যান্য সাংবিধানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, তেমনি সংবিধানের কাঠামোর মধ্য দিয়েই সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন। সুপ্রিমকোর্ট মঙ্গলবার আইনজীবীদের সঙ্গে ইফতার শেষে তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদের পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যা কিছু উল্লেখ করা হয়েছে, জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী আমরা তা বাস্তবায়ন করব। যেমন ইশতেহারে আমরা উপ-রাষ্ট্রপতির বিধান রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে, আমরা সেটিও কার্যকর করব। আমরা কেবল জুলাই সনদে সীমাবদ্ধ থাকব না, জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সব অঙ্গীকার পূরণে আমরা দায়বদ্ধ।’
গণভোটের রায়কে সম্মান দিতে হলে আগে জাতীয় সংসদে যেতে হবে উল্লেখ করে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে আলোচনা ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে আমরা সাংবিধানিকভাবে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করতে বাধ্য। সংসদই নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশ কীভাবে গৃহীত বা সংশোধিত হবে।
অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গাউছ বলেছেন, দলের বিভিন্ন নেতা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বক্তব্য দিয়ে থাকেন, যা কখনো কখনো ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে পারে। বিএনপির মূল অবস্থান হলো জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য পূরণে সংসদে প্রাণবন্ত ও যৌক্তিক আলোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, নতুন সংসদে এমন আলোচনার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
সরকারি দলের চিফ হুইপ মো নুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে সরকার গঠন করেছে, সেখানে সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। আমরা ইতোমধ্যে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেছি, যেখানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আশা করা যায়, দেশ একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতিতে কার্যকর প্রাণবন্ত সংসদ পাবে।’
বিরোধীদলীয় নেতারা বলছেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে তারা বিষয়টি সংসদের ভেতরে জোরালোভাবে উত্থাপন করবেন। প্রয়োজন হলে সংসদের বাইরে আন্দোলনের পথেও যাওয়ার কথা বিবেচনা করা হবে।
ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কার্যনির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, জুলাই সনদে দেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে। তাই এটি বাস্তবায়ন করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। যেসব বিষয়ে সবাই স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের নৈতিক দায়িত্বও সবার ওপর বর্তায়। সংসদে সরকারের ভালো উদ্যোগগুলোতে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে বলেও তিনি জানান। তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত এলে সংসদের ভেতরেই তার বিরোধিতা করা হবে এবং বিষয়টি জাতির সামনে তুলে ধরা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১১ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা ও রংপুর-৪ (পীরগাছা–কাউনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫–এর ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একই শপথ অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সেই শপথ গ্রহণ করেননি। এটি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ লঙ্ঘনের শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের সময় দেশের জনগণ স্পষ্টভাবে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। জনগণের সেই মতামতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যদি কেউ গণভোটের রায়কে পাশ কাটানোর চেষ্টা করে, তাহলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. আতিক মুজাহিদ জানান, বিরোধীদল হিসেবে জনগণের অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরবে এনসিপি। একটি বিরোধীদল যে ভূমিকা পালন করে, ঠিক সেই ধরণেই তাদের ভূমিকা থাকবে। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য যেসব বিষয় প্রয়োজন, সেগুলো সংসদে উত্থাপন করা হবে। সংসদের প্রথম ভাষণ থেকেই সরকারের অবস্থান অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
জুলাই সনদের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ডা. আতিক মুজাহিদ বলেন, সংসদের ভেতরে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। প্রয়োজনে রাজনৈতিকভাবে মাঠে আন্দোলনের মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে পরামর্শ দেবো, আপনারা যদি পুরোনো ধারার রাজনীতি করেন, তাহলে রাজনৈতিক সৌহার্দ্য নষ্টের দায় বিএনপিকেই নিতে হবে।’