বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
গত সপ্তাহে ‘গোপনে নয়াদিল্লি’ সফর করেন বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল কায়ছার রশীদ চৌধুরী।
সেখানে তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র’-এর) প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ডিরেক্টর লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম দুই দেশের শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন বৈঠক হল।
সূত্রের খবর, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস ধরে বন্ধ থাকা যোগাযোগের পথ আবার খোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষই এই বিষয়ে একমত হয়েছে, এমন কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, যাদের কার্যকলাপ অন্য দেশের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, মেজর জেনারেল কায়ছার রশীদ চৌধুরীর এই সফর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিৎসাজনিত কারণে’ বলে দেখানো হলেও কূটনৈতিক মহলে এটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন।
এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি সেনাবাহিনীর শীর্ষ স্তরে বড় রদবদল করে মেজর জেনারেল কায়ছার রশীদ চৌধুরীকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক (ডিজি) পদে নিয়োগ দেন।
তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা থেকে নয়াদিল্লিতে এটি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের সফর।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি যোগাযোগের চ্যানেল কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় দুই দেশের মধ্যে মূলত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের দপ্তরের মাধ্যমেই সীমিত যোগাযোগ বজায় ছিল।
তবে নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এখন তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন। এর ফলে পররাষ্ট্রনীতিতে কিছু ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে।
গত বছরের শেষ দিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
প্রায় আধঘণ্টার সেই বৈঠকে তিনি ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা জানান।
পাশাপাশি তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রিকে পাঠানো হয়েছিল, যা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
তবে এখনও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় বাংলাদেশের আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে।
এ ছাড়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে—সেটিও দুই দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে চলেছে।
গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক বিধিনিষেধও এখনো বহাল রয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে দেশে ফেরানোর জন্য ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করে। হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে ভারতের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল।
তথ্যসূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা