বলিউড তারকা রণবীর সিং অভিনীত ‘ধুরন্ধর’ ছবিটি গত বছর সিনেমা হলগুলোতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এবার পর্দায় এসেছে ‘ধুরন্ধর পার্ট ২’। আগের মতো এই ছবির পরিচালকও আদিত্য ধর। এই ছবির একটা দৃশ্য সাড়া ভারতজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে, যে দৃশ্যে রণবীর সিংকে রহমান ডাকাতের ভাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করা অভিনেতা অক্ষয় খান্না জিজ্ঞেস করেন, ‘কোথা থেকে আসছেন?’ উত্তরে রণবীর বলেন, ‘খেরোটাবাদ, কোয়েটা, নাম- হামজা আলি মাজারি।’
এই ছবিতে একজন ভারতীয় গুপ্তচরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রণবীর সিং, যিনি পাকিস্তানে গিয়ে সেদেশের নাগরিকের ছদ্মবেশে বসবাস করতে শুরু করেন।
এ তো গেল পর্দার গল্প। বাস্তবেও কিন্তু রণবীর সিং পরিবার ও তার পূর্বপুরুষরা পাকিস্তানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। কিন্তু সেটা কীভাবে? এই সম্পর্ক আজকের নয়। ১৯৪০ সালে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে একটি খ্রিস্টান পরিবার বাস করতো। যে গ্রামে এই পরিবারটি থাকত, সেই গ্রাম অধুনা পাকিস্তানে।
এই পরিবারেরই এক সদস্য ছিলেন যুবক স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক। পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার পরে তিনি ১১টি দেশে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হয়ে কাজ করেছেন। এই মার্টিন বার্ক-এর বোন চাঁদ বার্ক, হিন্দি ছবিতে একাধিক পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। চাঁদ বার্ক সম্পর্কে রণবীর সিংয়ের ঠাকুমা।
স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক সম্পর্কে আগ্রহ বাড়লে বিবিসি যোগাযোগ করে তার লন্ডন নিবাসী কন্যা নোয়েল পারসন্সের সঙ্গে। সম্পর্কে রণবীর সিংয়ের ঠাকুমার দাদা স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক পাঞ্জাবের নানকানা সাহেবের কাছে মার্টিনপুর গ্রামে ১৯০৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
নোয়েল পারসন্স বলেন, ‘দেশভাগের সময় আমদের বলা হয়েছিল যে কোনো এক দেশ বেছে নিতে। এটি বাবার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তার মনে এতটাই সংশয় তৈরি হয় যে তিনি অবিভক্ত ভারতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে লন্ডনে চলে আসেন।’
অন্যদিকে, দেশভাগের সময়ে রণবীর সিংয়ের ঠাকুমা বম্বে অর্থাৎ অধুনা মুম্বাই শহরে চলে আসেন। ‘সিনেমাজি’ নামে একটি ডকুমেন্টেশন প্রজেক্ট ভারতের পুরোনো দিনের ফিল্মের সঙ্গে যুক্ত বহু দুষ্প্রাপ্য আর্কাইভ ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্মৃতি সংরক্ষণের কাজের সঙ্গে যুক্ত।
সিনেমাজির সহ-প্রতিষ্ঠাতা আশা বাত্রা জানিয়েছেন, চাঁদ বার্ক হিন্দি ও পাঞ্জাবি ছবিতে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রথমে তিনি লাহোরে নির্মিত ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার নাচের পারদর্শিতার কারণে তাকে পাঞ্জাবের ‘ডান্সিং লিলি’ নামে ডাকা হতো।
রণবীর সিংয়ের পরিবারের গল্প অবিভক্ত ভারতের একাধিক অঞ্চল ও ভারতের বাইরে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৪৬ নাগাদ যখন দেশভাগের কথা উঠেছিল, তখন স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক একজন বিচারক হিসেবে পাঞ্জাবের প্রথম নির্বাচন পিটিশনস কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।
তার কন্যা নোয়েল পারসন্স জানিয়েছেন, যখন পাকিস্তান গঠন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছিল, তখন কমিশনের কাছে যারা দাবি পেশ করছিলেন, তাদের মধ্যে সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই ছিলেন।
তার আত্মজীবনী ‘আ লাইফ অফ ফুলফিলমেন্ট’-এ স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক লিখেছেন, ‘ওই সময়ে নিরপেক্ষ থাকার জন্য আমি একটি কৌশল অবলম্বন করেছিলাম। আমি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলাম যে দেশভাগের পরে আমি কোনো মতেই সরকারি চাকরিজীবী হতে চাই না। অবসর নেওয়াই আমার পক্ষে সম্মানজনক পদক্ষেপ বলে মনে করেছিলাম।’
বার্ক লিখেছিলেন, ‘যার ফলে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস থেকে সময়ের আগেই অবসর নেওয়া প্রথম এশীয় হিসেবে আমার নাম রয়ে গেল। এর ফলে যেটা হলো, আমি আমার নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানে শুধু একজন বেকারই নয়, বরং সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন হয়ে পড়লাম। যেখানে ইংরেজ আমলে আমি ভারতের সিভিল সার্ভিসে জজ ছিলাম ‘ নিজের বইতে লিখেছিলেন তিনি।
এই দ্বন্দ্বের মাঝেই স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক নিজের পরিবারকে নিয়ে ব্রিটেন চলে যান। তার ভাই ও বোনেরা কানাডায় পাড়ি জমান।