বাংলাদেশের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের সর্ববৃহৎ পেশাজীবী সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড টেকনোলজিস্টসের (আইটিইটি) কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগের ঘটনায় নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল ইউনাইটেড কাউন্সিল (ঐক্যবদ্ধ টেক্সটাইল প্রকৌশলী পরিষদ)-এর পক্ষ থেকে জিজি প্যানেলের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনৈতিক প্রচারণার লিখিত অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে সম্প্রতি উত্থাপিত এই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অমূলক, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম মনোনীত জিজি প্যানেলের প্রধান এবং সভাপতি পদপ্রার্থী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের এই অভিযোগকে অজ্ঞতাপ্রসূত ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন আইটিইটির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য সচিব এ.কে.এম. মহসিন আহমেদ।
নির্বাচন কমিশন বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগপত্রে মূলত কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি উল্লেখ করে ইউনাইটেড কাউন্সিল প্যানেল। এর মধ্যে প্রধান অভিযোগ হলো, এ.কে.এম. মহসিন আহমেদ একাধারে জিজি প্যানেলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন এবং ওই প্যানেলের নির্বাচন পরিচালনার মনিটরিং কমিটির অনুমোদনপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। ইউনাইটেড কাউন্সিলের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির শীর্ষ পদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন কর্মকাণ্ড সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, আইটিইটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির মূল দায়িত্ব হলো কেবল নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
উল্লেখ্য, আইটিইটির নির্বাচনী আচরণবিধির ৭.২ (i) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনী কার্যক্রমে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা তাদের অনুসারীদের সম্পৃক্ত করা নিষিদ্ধ। এই ধারা লঙ্ঘন করে জিজি প্যানেলের নির্বাচনী কার্যক্রমে ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলি এমপির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনের কাছে হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশ ও তা প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষকে সরবরাহের জোর দাবি জানিয়েছে প্যানেলটি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনাইটেড কাউন্সিল প্যানেলের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমরা নির্বাচন কমিশন বরাবর আমাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো জানিয়েছি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আমাদের লিখিত আবেদনটি গ্রহণ করেছেন। এখন আমরা অপেক্ষায় আছি যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন এ বিষয়ে কী ধরনের আইনগত বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তীব্র আপত্তি জানান আইটিইটির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য সচিব এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরামের সেক্রেটারি জেনারেল এ.কে.এম. মহসিন আহমেহ। তিনি বলেন, ‘ইউনাইটেড প্যানেলের পক্ষ থেকে সভাপতি পদপ্রার্থী আ ন ম আহমেদ উল্লাহ ভাই এই অভিযোগ করেছেন। তিনি সম্ভবত সংগঠনের গঠনতন্ত্রটি ভালো করে পড়ে দেখেননি। কারণ গঠনতন্ত্রে এমন কোনো নিয়ম নেই যে, আহ্বায়ক কমিটিতে থেকে নির্বাচন করা যাবে না অথবা নির্বাচনকালীন কোনো প্রচারণা চালানো যাবে না।
স্বাক্ষর ও নিরপেক্ষতার বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে এ.কে.এম. মহসীন আরও বলেন, ‘আমি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরামের মহাসচিব, একই সাথে আইটিইটির বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য সচিব। যে নির্বাচন মনিটরিং কমিটির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আমি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরামের মহাসচিব হিসেবে স্বাক্ষর করেছি। সে অধিকার আমার অবশ্যই আছে। আর অন্তর্বর্তীকালীন কমিটিতে থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নিরপেক্ষতা নষ্ট হওয়ার যে দাবি উনারা করছেন, তা নিতান্তই অমূলক। কারণ অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির অন্যান্য অনেক সদস্য কমিটিতে বহাল থাকার পরেও সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এমনকি যে প্যানেলটি অভিযোগ করেছে, সেই প্যানেলেরও একাধিক প্রার্থী আছেন যারা অলরেডি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে পদে রয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো সেখানে নির্বাচনও করছি না; আমি শুধুমাত্র নির্বাচন প্রচারণায় টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স ফোরাম মনোনীত প্যানেলের নির্বাচন মনিটরিং কমিটিতে স্বাক্ষর করেছি। উনারা কেন এমনটি করেছেন তা আমার জানা নেই, তবে হয়তো অজ্ঞতাবশত উনারা এই অভিযোগটি করেছেন, যার আসলে কোনো ভিত্তি নেই।’
এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জিজি প্যানেলের প্রধান এবং সভাপতি পদপ্রার্থী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন বলেন, ‘আইটিইটির গঠনতন্ত্র বা নির্বাচনী আচরণবিধির কোথাও উল্লেখ নেই যে আহ্বায়ক বা সদস্য সচিব নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কিংবা প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তাই এ ধরনের অভিযোগ মূলত গঠনতন্ত্র ও প্রযোজ্য বিধিবিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা নির্বাচন কমিশনকে অযথা বিব্রত করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘অতীতে পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো নজির না থাকলেও তিনি একটি প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিধায় নৈতিকতার প্রশ্নে স্বেচ্ছায় সদস্য সচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক বা সদস্য সচিবের নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ওপর কোনো আইনগত বা সাংগঠনিক বাধা রয়েছে।’
উপদেষ্টা পরিষদে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগেরও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন বলেন, ‘তাকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয় বরং একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার এবং আইটিইটির আজীবন সদস্য হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি। বরং পেশাগত জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ৩৭ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের তালিকায় তার নাম সর্বশেষে রাখা হয়েছে। একজন সম্মানিত সদস্য সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে তাকে সংগঠনের পরিসর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা আমাদের নেই। এ ধরনের অভিযোগ প্রকৃতপক্ষে একজন সম্মানিত আজীবন সদস্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার শামিল।’
জিজি প্যানেলের প্রধান আরও অভিযোগ করেন, তাদের প্যানেল নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করলেও প্রতিপক্ষ প্যানেলের কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রীয় বিষয়কে টেনে এনে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন। তিনি বলেন, ‘আইটিইটি একটি পেশাজীবী সংগঠন এবং জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু এনে নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা বা সমালোচনা করাই প্রকৃতপক্ষে আচরণবিধির পরিপন্থী।’
তবে এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের পরও তারা নির্বাচন কমিশনকে কোনোভাবে বিব্রত করবেন না উল্লেখ করে এনায়েত হোসেন জানান, পরিস্থিতি তারা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করবেন। একই সঙ্গে তিনি তার প্যানেলের সব প্রার্থী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের কুরুচিপূর্ণ বা উসকানিমূলক মন্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া না দেওয়া হয় এবং সবাই শালীনতা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখেন।
পরিশেষে প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন আইটিইটির বৃহত্তর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পেশাগত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে সকল পক্ষকে প্রতিহিংসা ও বিভাজনের মানসিকতা পরিহার করে সুস্থ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
ঐক্যবদ্ধ টেক্সটাইল প্রকৌশলী পরিষদের (ইউনাইটেড কাউন্সিল) জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগের বিপরীতে কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ বা অবস্থান জানতে নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে ফোনে এবং মেসেজ পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা চালালেও তাৎক্ষণিকভাবে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, আগামী ২৬ জুন আইটিইটির কার্যনির্বাহী পরিষদের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে জিজি প্যানেল এবং ইউনাইটেড কাউন্সিল প্যানেলের মধ্যে।