বর্ষার মেঘ, টানা বৃষ্টি আর উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে নতুন রূপে সেজেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। বর্ষার এই মনোমুগ্ধকর আবহ উপভোগ করতে সাপ্তাহিক ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো পর্যটক। অন্যদিকে, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হোটেল-রিসোর্টগুলো দিচ্ছে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়।
শুক্র ও শনিবার সকাল থেকেই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, শৈবাল ও কলাতলী পয়েন্ট। কেউ উত্তাল ঢেউয়ে শরীর ভেজাচ্ছেন, কেউ বালুচরে বসে উপভোগ করছেন বর্ষার সৌন্দর্য। আবার কেউ ঘোড়ায় চড়ে কিংবা ক্যামেরায় বন্দি করছেন স্মরণীয় মুহূর্ত।
সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি পর্যটকদের অনেকেই ভিড় করছেন পাহাড়, ঝাউবন ও মেরিন ড্রাইভ এলাকায়। বর্ষার সবুজ প্রকৃতি, মেঘলা আকাশ এবং উত্তাল সাগরের অপরূপ দৃশ্য কক্সবাজার ভ্রমণকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এটি আমার পঞ্চমবার কক্সবাজারে আসা। প্রতিবারই সৈকতে এসে ঘোড়ায় চড়ার অভিজ্ঞতা নিয়েছি। এবারও দারুণ উপভোগ করছি। কক্সবাজারের সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ।’
রাজশাহী থেকে আসা শাহীন দেলোয়ার বলেন, ‘বর্ষার কক্সবাজারের অনুভূতিটাই আলাদা। গরমের তীব্রতা নেই, রোদে সানবার্নের ঝুঁকিও কম। মনোরম আবহাওয়ায় সমুদ্রসৈকত ঘুরে বেশ উপভোগ করছি।’
মিরপুর থেকে আসা পর্যটক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে শীতের চেয়ে বর্ষার কক্সবাজার বেশি ভালো লাগে। এ সময় পর্যটকের চাপ তুলনামূলক কম থাকে। হোটেলে সহজে থাকা যায়, পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্যও মন ভরে উপভোগ করা যায়।’
তবে বর্ষার সৌন্দর্যের পাশাপাশি উত্তাল সাগর নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে লাইফগার্ড কর্মীরা। টানা বৃষ্টির কারণে সমুদ্রে ঢেউয়ের তীব্রতা বেড়েছে। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে বিপজ্জনক রিপ কারেন্ট (ক্যানেল) এবং কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে খাল ও গুপ্ত গর্ত। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লাল পতাকা টাঙিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
পর্যটন বিশ্লেষক আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, ‘সমুদ্রসৈকতে রেড ফ্ল্যাগ উত্তোলন করা হয়েছে। এর অর্থ হলো সমুদ্রে নামা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ পানিতে নামলে হাঁটুপানির বেশি গভীরে না যাওয়ার এবং অবশ্যই লাইফগার্ডের নজরদারির মধ্যে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটকদের সচেতন করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অনেকেই সতর্কবার্তা মেনে চলেন, আবার কেউ উপেক্ষা করেন। সচেতনতাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’
সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে সমুদ্র অত্যন্ত উত্তাল। বিভিন্ন স্থানে বিপজ্জনক রিপ কারেন্ট তৈরি হয়েছে। তাই আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোল টিম, উদ্ধার সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত লাইফগার্ডরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।’
এদিকে বর্ষা মৌসুমকে পর্যটনের অফ-সিজন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পর্যটক টানতে বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কক্সবাজারের হোটেল ও রিসোর্টগুলো। অনেক প্রতিষ্ঠানেই সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়া হচ্ছে।
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের বিপণন ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নূর সোমেল বলেন, ‘বর্ষাকালে কক্সবাজারের সৌন্দর্য ভিন্ন রূপ ধারণ করে। বৃষ্টি, উত্তাল সমুদ্র ও সবুজ পাহাড় মিলিয়ে প্রকৃতি এ সময় অনন্য সৌন্দর্য তৈরি করে। পর্যটকদের ভ্রমণ আরও সাশ্রয়ী করতে আমাদের হোটেলে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অতিথিদের নিরাপদ ও আরামদায়ক অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’
টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক তানভীর ইসলাম জানান, বর্ষা মৌসুমে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকতজুড়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে লাইফগার্ড, টুরিস্ট পুলিশ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।