শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার টানা ২১ বছর ধরে একই উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। এর পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে নিয়মিত দেরিতে অফিসে আসা, অফিসে উপস্থিত না হয়েও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা এবং সেবাগ্রহীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, তাছলিমা আক্তার ২০০৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভেদরগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্যেও একই তারিখ উল্লেখ রয়েছে। এরপর থেকে তিনি একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সরকারি চাকরিবিধি ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার সুযোগ না থাকলেও তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ওই উপজেলায় বহাল রয়েছেন।
সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের মে মাসে তাকে অন্যত্র বদলি করা হলেও মাত্র দুই মাস পর, একই বছরের জুলাই মাসে তিনি আবার ভেদরগঞ্জে ফিরে আসেন এবং পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সূত্র আরও জানিয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাছলিমা আক্তার অধিকাংশ দিন সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে অফিসে আসেন। এমনকি অনেক সময় অফিসে উপস্থিত না হয়েও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই অফিস ত্যাগ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত অফিস সময় পেরিয়ে গেলেও উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কক্ষ তালাবদ্ধ। সেবা নিতে আসা অনেক নারী ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তাছলিমা আক্তারের দেখা পাননি।
দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রানু বেগম বলেন, ‘অনেক দূর থেকে এসেছি। এসে দেখি অফিস বন্ধ। শুনেছি ম্যাডাম দুপুরের আগে আসেন না। বাড়িতে ছোট সন্তান রেখে এসেছি। এখন সেবা না নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।’
কাচিকাটা ইউনিয়নের গর্ভবতী সেলিনা আক্তার বলেন, ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি'র আবেদন সংশোধনের জন্য দুই দিন ধরে আসছি। দুই দিনই অফিস তালাবদ্ধ পেয়েছি। অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার ঘুরেও কর্মকর্তার দেখা পাইনি।’
একই ধরনের অভিযোগ করেন রিয়া বেগম, আয়েশা আক্তারসহ আরও কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
সেবা নিতে আসা জাকির হোসেন বলেন, ‘সরকারি অফিস সকাল ৯টায় শুরু হয় জেনে সময়মতো এসেছি। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কর্মকর্তাকে পাইনি। সাধারণ মানুষ সময় মেনে এলেও সেবা পাচ্ছে না।’
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এস এম রাশেদুল ইসলাম মনে করেন, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হয়। ২১ বছর ধরে একই জায়গায় কর্মরত থাকা অস্বাভাবিক। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘অফিসে না এসে বাসা থেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার প্রশ্নই আসে না। তবে মাঝে মধ্যে অফিসে আসতে একটু দেরি হয়, এটা সত্য।’ হাজিরা সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার শত্রুরা এসব তথ্য দিচ্ছে। এগুলো অফিসিয়াল তথ্য, আপনারা কীভাবে পেলেন?’ পরে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক রাফিয়া ইকবাল বলেন, ‘বাসা থেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার কোনো নিয়ম নেই। তিনি কীভাবে এত বছর একই কর্মস্থলে আছেন, সেটিও আমার জানা নেই। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা এবং অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকা, নির্ধারিত সময়ের আগে অনুমতি ছাড়া অফিস ত্যাগ না করা এবং ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।