লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত খুনিকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত খুনির বাড়ী-ঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে তিনটি ঘর ও আসবাবপত্র আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। একইসময় পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ ঘটে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) এ ঘটনা ঘটে।
উত্তেজিত জনতার ছোড়া ইটের আঘাতে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকসহ ৩০জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে বলে জানা যায়। এ সময় তারা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ ছয়টি সরকারি গাড়ি ভাংচুর করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে ঘটনাস্থলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয় ও পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। আহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, দায়িত্বে অবহেলার জন্য আদিতমারী থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হককে থানা থেকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড করা হয়েছে।
নিহত শিশুর পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণ করার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে ধর্ষণের বিষয়টি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। লাশ লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্হে পাঠানো হয়েছে।’
আটক অভিযুক্ত খুনি ফলিমারী গ্রামের বিধান চন্দ্র বর্মণ। নিহত শিশুটি স্থানীয ব্র্যাক প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলো।
পুলিশ ও পরিবারের লোকজন জানায়, প্রতিদিনের মতো শিশুটি খেলাধুলার জন্য সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। সে সন্ধ্যা পযর্ন্ত বাড়িতে ফিরে না আসলে পরিবারের লোকজন খুঁজতে থাকে। সারা রাতজুড়ে বিভিন্ন স্থানে শিশুটির সন্ধান করেন পরিবারের লোকজন। কিন্তু কোথাও শিশুটির সন্ধান মেলেনি।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় লোকজন গ্রামের জাবেদ আলীর ভুট্টাখেতে ভুট্টা গাছ ভাঙ্গা দেখতে পেয়ে সন্দেহ হয়। তারা ভুট্টাখেতের ভেতরে গিয়ে গর্ত দেখতে পান। গর্তের মধ্যে শিশুটির মরদেহ বস্তাবন্দী করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। পরে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
শিশুটির বাবা জানান, ‘আমার সাথে গ্রামের কারও কোনো দ্বন্দ নেই। আমি একজন কৃষক। খুব সাধারন জীবনযাপন করি। সোমবার দুপুরেও আমি মেয়েকে সাথে নিয়ে দুপুরের আহার করেছিলাম। আমার ছোট মেয়েটিকে জোরপুর্বক ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। আমি বিচার চাই।’
তিনি অভিযোগ করেন, তার মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর সোমবার রাত ১১টার দিকে আদিতমারী থানায় অভিযোগ করতে গেলে থানার ওসি বিষয়টি আমলে নেননি। তিনি বলেন, ‘ওসি যদি রাতে ব্যবস্থা নিতো তাহলে হয়তো আমার মেয়েকে জীবিত ফেরত পেতাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামের বাইরের এলাকা থেকে দলে দলে লোক এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে এবং তারা পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলা চালিয়ে সরকারি গাড়ি ভাংচুর করেন। তারাই অভিযুক্ত ধর্ষক ও খুনির বাড়ি ভাংচুর করে অগ্নিসংযোগ করেন। আমি পুলিশের সাথে উপস্থিত ছিলাম।’
শিশুটির মা বলেন, ‘আমার মেয়ে প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির বাইরে খেলতে যেতো। সোমবার বিকেলেও খেলতে গিয়েছিল। বাড়ির পাশে বেশ কয়েকটি ভুট্টাখেত রয়েছে। হয়তো আমার মেয়েকে প্রলোভন দেখিয়ে অথবা জোরপুর্বক ধরে নিয়ে গিয়ে ভুট্টাখেতে আটকে রেখে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
আদিতমারী থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) তুহিন মিয়া জানান, এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা সে বিষয়ে আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান জানান, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলাবারী ও সরকারি গাড়ি ভাংচুরকারীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহনের প্রস্তুতি চলছে। যেহেতু থানার ওসি রাতে ভিকটিমের পরিবারকে আইনি সহায়তা দিতে অবহেলা করেছে তাই ওসিকে ক্লোজড করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে বর্তমানে স্বাভাবিক পরিবেশ রয়েছে।