ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হওয়ার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও মেরামত হয়নি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের গড়ইমহল সড়কটি। সাত গ্রামের মানুষের চলাচলের প্রধান এই সড়কটি এখন যেন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভাঙা সড়কের পরিবর্তে স্থানীয়দের নির্মিত একটি অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোই এখন হাজার হাজার মানুষের একমাত্র ভরসা।
২০২০ সালে আম্ফানের সময় জলোচ্ছ্বাসের প্রবল স্রোতে গড়ইমহল সড়কের একটি বড় অংশ ধসে গিয়ে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর নৌকায় যাতায়াত করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যান কুড়িকাহুনিয়া, নাপনা, শ্রীপুরসহ সাতটি গ্রামের মানুষ। পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য সহায়তা ও এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে একটি অস্থায়ী ভাসমান বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। তবে জরাজীর্ণ এই সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মিথিলা সুলতানা বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে আমাদের ৭৬ শতক ভিটাবাড়ি মাত্র ১৫ মিনিটে বিলীন হয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে আমরা দীর্ঘ ১১ মাস সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সব কষ্ট আমরা সহ্য করেছি। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ হচ্ছে আমাদের সন্তানরা। তাদের স্কুল-কলেজে পাঠানোর সুযোগই হচ্ছে না, কারণ আমরা একটি ভালো রাস্তা পাচ্ছি না। এক বছর হলো চেয়ারম্যান আমাদের একটি বাঁশের সাঁকো দিয়েছেন। সামনের বর্ষাকাল এটি টিকবে কি না জানি না। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করি, যেন আমাদের সন্তানরা একটি নিরাপদ রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে।’
নাকনা গ্রামের বাসিন্দা ডা. নিহার সরকার বলেন, প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনাইটেড একাডেমি হাই স্কুল, এপিএস ডিগ্রি কলেজ, প্রতাপনগর এবিএস ফাজিল মাদ্রাসা, আল-আমিন মহিলা মাদ্রাসা, ফুলতলা ও তালতলা বাজারে যাওয়ার প্রধান স্থলপথ এটি। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করে। রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, যেন দ্রুত এই বিচ্ছিন্নতা দূর করে স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা জানায়, বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী যাতায়াতের সময় নিচে পড়ে আহতও হয়েছে। তারা দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলে দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়লে শিশু ও বৃদ্ধদের পারাপার করানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করেও তারা কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি। দ্রুত সড়কটি সংস্কার না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ বিষয়ে প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী বলেন, ‘কুড়িকাহুনিয়ার কাঁঠালতলা থেকে মকবুল দোকানদারের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৭০০ ফুট রাস্তা বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি দিয়ে পারাপারে মানুষের খুব ভোগান্তি হচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিশুদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে কুড়িকাহুনিয়া, সনাতনকাঠি,নাকনা, গোকুলনগর, গোয়ালকাটি ও শ্রীপুরসহ সাত গ্রামের মানুষ চলাচল করে। রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ার আগে এটি হিয়ারিং বাঁধের রাস্তা ছিল। এখানে কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণ করা হোক।’
আশাশুনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের পাশের একটি রাস্তা ওয়াশ আউট হয়ে গভীর খাদ সৃষ্টি হয়। এলজিইডির বাজেট স্বল্পতার কারণে তখন স্থায়ীভাবে কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় প্রায় ৭০০ ফুট দীর্ঘ একটি অস্থায়ী ভাসমান বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। সাঁকোটি নষ্ট হয়ে গেলে এবং স্থানীয়ভাবে চাহিদা থাকলে ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে আবারও মেরামত করা হবে। জায়গাটি অনেক গভীর হয়ে গেছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ মাটি ভরাট করতে হবে, যা ব্যয়বহুল। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় আপাতত স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
দীর্ঘ ছয় বছরের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে অবিলম্বে সড়কটি পুনঃনির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।