চলতি মৌসুমের শুরুতেই আলুর দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে উত্তর অঞ্চলের জেলাগুলোতে। নতুন আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষক। ন্যায্য দাম না পেয়ে গতবারের মতো এ বছরও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা। চাষিরা বলছেন, বাজারে গত বছরের অবিক্রীত আলু এখনো থেকে যাওয়া, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও আলু সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় পাইকারি বাজারে দাম কমে গেছে। পাশাপাশি খুচরা বাজারেও আলুর দামে ব্যাপক ধস নেমেছে।
পাইকারি বাজারে এক কেজি আলু বিক্রি করে মিলছে না এক কাপ চায়ের দাম। ফলে হতাশায় ভেঙ্গে পড়েছেন আলু চাষিরা। তারা বলছেন আলু আবাদ করে বিপদ না করেও বিপদ। আলুর এই ভরা মৌসুমে দাম কিছুটা কমবে তবে এতটা দাম কমবে তা ভাবতে পারছেন না উত্তরের চাষীরা।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে রংপুর সিটি বাজার সহ উত্তরের বিভিন্ন হাটবাজারে খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেছে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১০ ৎেকে ১২ টাকা দরে। আর প্রতি কেজি আলু উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ১৪ টাকা। ফলে প্রতি কেজি কৃষকের লোকসান দুই থেকে তিন টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৭ লাখ টনই হয়েছিল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮৪ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও পাবনাসহ প্রধান উৎপাদনকারী জেলার কৃষকরা জানান, বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন খরচ পড়েছে কেজি প্রতি ১৮-২২ টাকা। বর্তমানে পাইকারি বাজারে নতুন আলু কেজিপ্রতি ১৫-১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে তারা উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না।
রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার আলুচাষি সুজন রহমান জানান, গত মৌসুমে আলু চাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আলু চাষ করেছেন তিনি। গত বছরের মতো এবারও উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে পথে বসার অবস্থা তার। কাউনিয়া উপজেলার আরেক কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আলুর ভরা মৌসুম আসতে এখনো প্রায় এক মাস বাকি। মূলত বেশি দাম পাওয়ার আশায় কৃষক আগাম আলু চাষ করেন। গত বছরের আলু এখনো বাজারে থেকে যাওয়ায় নতুন আলুর চাহিদা কমে গেছে। ফলে দাম পড়েছে।
লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ উপজেলা শিয়াল খোওয়ার কৃষক হাসিম মিয়া জানান, তিনি ১৮ বিঘা জমিতে এবার কার্ডিনাল আলু চাষ করেছেন। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২২ টাকা। অথচ বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৮ টাকা কেজি।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির সুযোগ সীমিত এবং সংরক্ষণ খরচ বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় পরিসরে আলু কিনছেন না। এ ছাড়া সিন্ডিকেটের দাপট আর মৌসুমে অতিরিক্ত ফলনের কারণে বাজারে চাহিদা কমে আলুর দাম পড়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও কৃষক কেন্দ্রিক নীতি থাকলে এই ক্ষতি এড়ানো যেত।
রংপুর বিভাগের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহিন মিয়া বলেন, আগের বছরের তুলনায় আলুর আবাদ কিছুটা কমেছে, যা মৌসুমের শেষ দিকে সরবরাহ ও দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলাতেই প্রচুর আলু আবাদ হয়ে থাকে। চাহিদা তুলনার অতিরিক্ত আলু চাষাবাদ হওয়ায় বিপাকে পড়তে হয় কৃষককে। এবছরও লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে বেশি আলু আবাদ হয়েছে।
কৃষিবিদরা মনে করছেন যদি আলু রপ্তানি করা না হয় তাহলে এ দুরবস্থা থেকে কৃষকের বের হওয়ার কোন উপায় নেই। তাই সরকারের উচিত এ ফসলের দিকে নজর দেওয়া।