মেক্সিকোর কুখ্যাত পুলিশ অফিসার থেকে বিশ্বের অন্যতম ত্রাস ‘মাদক সম্রাট’ হয়ে ওঠার গল্পটি ল্যাটিন আমেরিকার অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং ভয়ংকর অধ্যায়। এই নেপথ্য নায়ক হলেন নেমেসিও ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস, যাকে অপরাধ জগত চেনে ‘এল মেঞ্চো’ নামে। মার্কিন সমর্থনপুস্ট একটি অভিযানে নিহত হয়েছেন এল মেঞ্চো। এরপর গোটা মেক্সিকো জ্বলে উঠেছে। মেঞ্চোর অনুসারীরা বিভিন্ন অঞ্চলে নারকীয় তাণ্ডব শুরু করেছে। কে এই মেঞ্চো? যার এত প্রভাব প্রতিপত্তি?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্দিতে এক সময় শপথ নিয়েছিলেন সমাজকে অপরাধমুক্ত করার। কিন্তু সময়ের ফেরে সেই রক্ষকই হয়ে উঠলেন ভক্ষক। মেক্সিকোর এক সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা থেকে আজ তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ১ নম্বর অপরাধী। যার মাথার দাম হাঁকা হয়েছিল ১০ মিলিয়ন ডলার। তিনিই নেমেসিও ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস, আন্ডারওয়ার্ল্ড যাকে চেনে ‘মেঞ্চো’ নামে।
১৯৬৬ সালে মেক্সিকোর মিকোয়াকান রাজ্যের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম মেঞ্চোর। অভাবের তাড়নায় স্কুল ছেড়ে নাম লেখান অ্যাভোকাডো চাষে। এরপর ভাগ্য বদলাতে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। সেখানে কিছুদিন মাদক পাচারের দায়ে জেল খেটে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মেক্সিকোয় ফিরে আসেন তিনি।
ফিরে এসে মেঞ্চো সবাইকে অবাক করে দিয়ে যোগ দেন রাজ্য পুলিশে। আইন-কানুনের মারপ্যাঁচ এবং পুলিশের অন্দরমহলের সব খবর তিনি রপ্ত করেছিলেন এই উর্দিতে থেকেই। কিন্তু তলে তলে তিনি যোগাযোগ রাখতেন স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে। কয়েক বছরের মধ্যেই উর্দিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি পুরোপুরি অন্ধকার জগতে নেমে যান।
পুলিশের প্রশিক্ষণ মেঞ্চোকে একজন সাধারণ মাদক ব্যবসায়ী থেকে দক্ষ সেনাপতিতে রূপান্তর করে। তিনি গড়ে তোলেন ‘জ্যালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল’ বা সিজেএনজি। অতি অল্প সময়ে মেঞ্চো মেক্সিকোর আরেক কুখ্যাত সম্রাট ‘এল চ্যাপো’র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।
মেঞ্চোর এই কার্টেল কেবল মাদক পাচার করে না, তারা মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধেও লিপ্ত হয়। ২০১৫ সালে মেঞ্চোর নির্দেশে তার বাহিনী রকেট লঞ্চার ব্যবহার করে মেক্সিকান সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারও ভূপাতিত করেছিল, যা ইতিহাসেও বিরল।
মেঞ্চোর উত্থানের পেছনে রয়েছে সীমাহীন নৃশংসতা। তার শত্রুরা তাকে চেনে ‘মৃত্যুদূত’ হিসেবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বাহিনীর অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম এবং ড্রোন ব্যবহারের ভিডিও দেখে মেক্সিকান সরকারেরও পিলে চমকে যায়। তিনি মেক্সিকোর প্রায় প্রতিটি রাজ্যে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং ড্রাগ রুটগুলো নিজের দখলে নিয়েছেন।
২০১৭ সালে এল চ্যাপোর পতনের পর মেঞ্চো এখন বিশ্বের প্রধান ড্রাগ লর্ড। তার কার্টেল এখন পাঁচ মহাদেশে বিস্তৃত। আমেরিকা, ইউরোপ এমনকি এশিয়ার বাজারেও তার নেটওয়ার্ক সক্রিয়। মার্কিন বিচার বিভাগ তাকে ‘জননিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তার অবস্থান মেক্সিকোর দুর্গম পাহাড়েই বেশি থাকতো। যেখানে হাজারো সশস্ত্র প্রহরী তাকে ঘিরে থাকে।
এল চ্যাপো যেমন প্রচার ভালোবাসতেন, মেঞ্চো ঠিক তার উল্টো। খুব কম মানুষই তার সাম্প্রতিক চেহারা দেখেছে। তিনি সর্বদা পর্দার আড়াল থেকে কাজ পরিচালনা করতে ভালোবাসতেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এই মাদক সম্রাট নিজের এলাকায় এতটাই জনপ্রিয় যে, স্থানীয়দের অনেক সময় তিনি ত্রাতা হিসেবে সাহায্য করেন, যাতে পুলিশের হাত থেকে তিনি সুরক্ষা পান।
একজন পুলিশ অফিসারের শপথ থেকে শুরু হয়ে ১০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষিত অপরাধী হয়ে ওঠার এই সফরটি বিশ্ব অপরাধ বিজ্ঞানে একটি বড় কেস স্টাডি। ‘মেঞ্চো’ কেবল একটি নাম নয়, বরং মেক্সিকোর ভঙ্গুর আইন ব্যবস্থা এবং ড্রাগ কার্টেলের ভয়ানক দাপটের এক জীবন্ত প্রতীক।