সারা দেশে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারণকে ঘিরে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছেন ছাত্রদলের অন্তত দুই ডজনের বেশি নেতা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে জায়গা করে নিতে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি সিনিয়র নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করছেন পদপ্রত্যাশীরা।
দলীয় সূত্র বলছে, ঈদুল ফিতরের আগেই জানানো হয়েছিল যে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হতে পারে। ইতোমধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, কারা-নির্যাতনের শিকার ও পরিচ্ছন্ন ইমেজধারী নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।
বরাবরের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতৃত্বের দৌড়
ঐতিহাসিকভাবেই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেশনের নেতারা। এবারও তার ব্যত্যয় নেই। যেমন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন ২০০৭-০৮ সেশনের শিক্ষার্থী এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, ২০০৮-০৯ সেশন থেকে আলোচনায় বর্তমান কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, যিনি নিজেও সভাপতি পদের অন্যতম প্রার্থী, আরও আলোচনায় বর্তমান সহ-সভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল, এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সভাপতি প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত নাম বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল ও সাফি ইসলাম। ২০০৯-১০ সেশন থেকে আলোচনায় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, ফারুক হোসেন, মো. রাজু আহমেদ, হাসানুর রহমান, সালেহ মোহাম্মদ আদনান, ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম (আরিফ), মাসুদুর রহমান, বায়েজিদ হোসেন ও প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ।
এ ছাড়া ২০১০-১১ সেশনের ঢাবি সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক ও ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী নাহিদুজ্জামান শিপন, কেন্দ্রীয় সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, ২০১২-১৩ সেশন থেকে নূর আলম ভূঁইয়া ইমন, মানসূরা আলম, মাহবুব আলম শাহিন, তৌহিদুল ইসলামও রয়েছেন দৌড়ে।
সুপার ফাইভে নতুন মুখের প্রত্যাশা
ছাত্রদলের ‘সুপার ফাইভ’ বলতে বোঝানো হচ্ছে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সিনিয়র সহসভাপতি ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক—এই পাঁচটি পদকে। আর এই পদগুলোকে কেন্দ্র করেই মূল প্রতিযোগিতা। বর্তমানে এই পাঁচটি পদই ঢাবি কেন্দ্রিক হলেও, এবার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারাও প্রতিনিধিত্ব চান।
ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচন মূলত দুইভাবে হয়ে থাকে—কাউন্সিল ও সিলেকশন। সর্বশেষ কমিটি সিলেকশন পদ্ধতিতে হলেও, ২০১৯ সালে দীর্ঘ ২৯ বছর পর কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের নজির রয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় জেলা কমিটিগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল আয়োজন কঠিন বলে মনে করছেন নেতারা।
এদিকে সংগঠনের ভেতরে বর্তমানে অন্তত পাঁচটি বলয় সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন নেতারা। এসব বলয়ের পেছনে সাবেক শীর্ষনেতাদের প্রভাব রয়েছে। রকিবুল ইসলাম বকুল, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, আব্দুল কাদির ভূইয়া জুয়েল, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ এবং আকরামুল হাসান মিন্টুর নেতৃত্বে আলাদা আলাদা গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। ফলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে ছাত্রদলকে আরও গতিশীল করতে শীর্ষ নেতৃত্বের বয়স কমিয়ে আনার কথা ভাবছে বিএনপি। তবে মাত্র ক্ষমতায় আসা এবং দীর্ঘদিন পদবঞ্চিতদের হুট করে সামনের সারি থেকে সরিয়ে দলের অন্যান্য সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করাও সহজ হবে না বলেই মনে করছেন তারা। তাই এ ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা দেখালেও শীর্ষ পাঁচে কমে যেতে পারে নেতৃত্বের বয়স। বিশেষত ২০১২-১৩ সেশন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনা বেশি যা এই প্রতিযোগিতাকে সম্ভাব্যতার ভিত্তিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। তবে এর মধ্যেই বরাবরের মতো কেন্দ্রীয় পদে প্রাধান্য পাচ্ছে ঢাবি নেতৃত্বই।
ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘দলের কঠিন সময়ে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম, আন্দোলন সংগ্রামে কোনোদিন মাঠ ছেড়ে যাইনি, মাঠের প্রতিটি আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে আন্দোলন করেছি। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে যদি কেন্দ্রীয় কমিটিতে আমাকে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয় তবে আগামী দিনে একটি মেধা ও সৃজনশীল শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্ব উপহার দিতে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’
ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক রাজু আহমেদ বলেন, ‘ছাত্রদলের নেতৃত্ব বাছাইয়ে একদিকে যেমন ত্যাগীদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত, আরেকদিকে পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতৃত্ব সামনে আনতে হবে। এই তালিকায় আমার নাম থাকা মানে হচ্ছে আমাকে তারা যোগ্য মনে করছেন এবং নেতৃত্বের আলোচনায় রেখে আমার এতদিনের ডেডিকেশনকেই মূল্যায়ন করা হয়েছে। দলের এই স্বীকৃতিই আমাকে উৎসাহিত করতে যথেষ্ট। এখন কেন্দ্র থেকে যেভাবেই কমিটি দেওয়া হোক এবং যাকেই নির্বাচিত করা হোক আমি ছাত্রদলের জন্য কাজ করছি, সামনেও করে যাব।’
সূত্র বলছে, শীর্ষ দুটি পদে যেতে না পারলেও সুপার ফাইভের জন্য আলোচনায় আছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, ঢাবি সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং ঢাবি সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত ভিপি (সহ-সভাপতি) প্রার্থী মো. আবিদুল ইসলাম খান আবিদও আছেন এই দৌড়ে।
তবে এবার আগের পথে না হেঁটে ঢাকার বাইরে ও অন্যান্য ইউনিট থেকেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাওয়ার আলোচনায় আছেন কেউ কেউ। তাদের মধ্যে রয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ছাত্র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মো. বাবর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম. রাজীবুল ইসলাম তালুকদার (বিন্দু)।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মো. বাবর বলেন, ‘বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাই নেতৃত্বে বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রথম পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ভারসাম্য দরকার।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ‘প্রথম পাঁচটি পদে ভারসাম্য আনা হলে তা ঢাবিসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিটের নেতৃত্বকে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু করতে এবং দলের মূল্যায়নের মাধ্যমে উপযুক্ত স্থান পেতে আগ্রহী করে তুলবে। পাশাপাশি সংগঠনের কার্যক্রম, কার্যকারিতা আরও বাড়বে।’
তবে, ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। পদপ্রত্যাশী নেতাদের প্রত্যাশা—আন্দোলনে পরীক্ষিত, ত্যাগী ও তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের দিয়েই নতুন নেতৃত্ব গঠিত হবে।
সভাপতি পদে আলোচনায় যারা
সভাপতি পদে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী ঘুরেফিরে আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, ঢাবি সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, ১ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, ঢাকা মহানগর পূর্ব সভাপতি সোহাগ ভূইয়া ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মো. আদনান।
দলীয় বিশেষ সূত্রে জানা যায়, সভাপতি পদের দৌড়ে আমানউল্লাহ আমান, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ ও মোস্তাফিজুর রহমান তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছেন। আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, একাধিকবার কারাবরণ এবং সংগঠনের দুঃসময়ে ভূমিকার কারণে তারা হাইকমান্ডের বিবেচনায়।
সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থী
সাধারণ সম্পাদক পদেও প্রতিযোগিতা তীব্র। আলোচনায় আছেন—ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাকিবুল ইসলাম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান।