একুশে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এলেই হঠাৎ করে যেন এক অদৃশ্য ‘বাংলা পরীক্ষা’ শুরু হয়ে যায়। কে কত শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে, কার কথায় কত বিদেশি শব্দ ঢুকে যায়, কে ব্যঞ্জনবর্ণ গড়গড় করে বলতে পারে, এসব নিয়ে শুরু হয় প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিচার। অথচ ভাষা তো কেবল ব্যাকরণ বা বানানের পরীক্ষা নয়, ভাষা মানুষের বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা এবং সামাজিক পরিবেশের ফল।
একটি শিশু যখন জন্মায়, তার কোনো ব্যাকরণ জানা থাকে না। সে পরিবেশ থেকে ভাষা শেখে। মায়ের মুখের শব্দ, আশপাশের মানুষের উচ্চারণ, মিডিয়ার ভাষা, স্কুলের ভাষা সব মিলিয়েই তার ভাষাগত পরিচয় গড়ে ওঠে। তাকে আলাদা করে ব্যাকরণ মুখস্থ করে কথা বলতে হয় না।
তাহলে আজ যদি কোনো তরুণ-তরুণী বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলে, সেটাকে কি শুধুই তার ‘অযোগ্যতা’ বলা যায়, নাকি তার চারপাশের বাস্তবতার প্রতিফলন?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইংরেজি জানার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। ভালো চাকরি, করপোরেট সেক্টরে প্রবেশ ও উচ্চশিক্ষার অনেক জায়গাতেই ইংরেজির কদর স্পষ্ট। ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানদের ইংরেজিমুখী করে তুলতে সচেষ্ট। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল, ইংরেজি ভাষার কোচিং, ইংরেজি কনটেন্ট, সবকিছু মিলিয়ে তাদের ভাষাগত পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই দ্বিভাষিক হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় আমরা যদি আশা করি তারা সম্পূর্ণ বিদেশি শব্দবিহীন ‘ঝরঝরে’ বাংলা বলবে, তবে সেটা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ ভাষাকে শুধু আবেগের জায়গা থেকে দেখলেই হবে না, এটি সামাজিক পুঁজিও।
অন্যদিকে, এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে সামাজিক মাধ্যম বড় ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, নেটফ্লিক্স—প্রতিনিয়ত তরুণরা বহুভাষিক কনটেন্টের সংস্পর্শে আসছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ভাষায় নতুন শব্দ ঢুকবে, নতুন স্টাইল আসবে।
বিশ্বায়নের এই সময়ে ভাষার মিশ্রণ অস্বাভাবিক নয়, ভাষার বিবর্তনের অংশ। ‘জেনজি’ নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে, কিন্তু তাদের ভাষাগত বাস্তবতা তৈরি করেছে এই সমাজই।
প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই দেখা যায় কিশোর-কিশোরীদের সামনে ক্যামেরা ধরে হঠাৎ ব্যঞ্জনবর্ণ জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, যেন এটাই বাংলা জানার চূড়ান্ত প্রমাণ। অথচ ব্যঞ্জনবর্ণ মূলত একটি বিন্যাসের বিষয়, কোন বর্ণের পর কোন বর্ণ আসে, সেটি অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর। নিয়মিত চর্চা না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সেই ধারাবাহিকতা ভুলে যেতে পারে যে কেউ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে গড়গড় করে মুখস্থ বলতে না পারলেই কি সে বাংলা জানে না? যে ব্যক্তি বর্ণের ক্রম মুখস্থ বলতে পারে না, সে-ই তো একই বর্ণ ব্যবহার করে শব্দ লিখতে পারে, বলতে পারে।
এখানে আরেকটি সামাজিক কারণ রয়েছে—শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজন। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা—এই তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা ভাষাগত ভিন্নতা তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহর-গ্রাম বৈষম্য। শহুরে শিক্ষার্থীদের ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রভাব বেশি, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ভাষা তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। ফলে ভাষা নিয়ে এক ধরনের শ্রেণিভিত্তিক বিচারও তৈরি হচ্ছে।
আরেকটি বিষয় হলো, আমরা বাংলা ভাষাকে আবেগের জায়গায় রাখলেও দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারে অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। সরকারি দপ্তর, করপোরেট অফিস, এমনকি উচ্চশিক্ষায়ও বাংলার ব্যবহার সীমিত। বাস্তবে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল দিবসে আবেগ দেখালে তা শুধু দ্বিচারিতা হয়েই দাঁড়ায়।
লেখক: সাংবাদিক