জুলাই আন্দোলনকারীদের উদ্যোগে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একাধিক শীর্ষ নেতাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধারাবাহিকভাবে এসব হুমকির ঘটনায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। জুলাই আন্দোলনকারীদের অন্যতম শরিফ ওসমান হাদিও এরকম হত্যা হুমকি পেতেন। এক পর্যায়ে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে হুমকির বিষয়টি প্রকাশ করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত। এর আগে একই দলের যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশিরকে হোয়াটসঅ্যাপে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
দলটির দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সদস্যসচিব ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেনও প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম এবং সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহও একই ধরনের হুমকির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর আগে গত ডিসেম্বরেও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক এবং নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সে সময় এ সংক্রান্ত কয়েকটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এনসিপি নেতারা এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জুলাই আন্দোলনে অন্যতম স্বতন্ত্র শক্তি ইনকিলাব মঞ্চের প্রয়াত মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের আগে একাধিকবার তাকে ফেসবুকে ও মুঠোফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হাদি আওয়ামী বিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত মুখ ছিলেন। এ কারণে তাকে আগে থেকেই হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে তিনি বেশ কয়েকবার জানিয়েছিলেন।
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত নাগরিক প্রতিদিনকে জানান, তিনি রমনা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন এবং এ বিষয়ে প্রশাসনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখতে চান।
তিনি আশাপ্রকাশ করেন, প্রশাসন আন্তরিকভাবে বিষয়টি তদন্ত করবে এবং যারা হুমকি দিয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সিফাত বলেন, ‘আমরা মনে করতে চাই, প্রশাসন এ ব্যাপারে আন্তরিক থাকবে। কিছু ক্ষেত্রে তারা হয়তো চেষ্টা করছে, কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আমরা তাদের প্রতি ইতিবাচক থাকতে চাই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তারা দোষীদের চিহ্নিত করবে এবং আইনের আওতায় আনবে।’
এছাড়া এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশিরকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তার। এ ঘটনায় গত ২ ফেব্রুয়ারি তিনি হাতিরঝিল থানায় জিডি করেছিলেন।
জিডি-পরবর্তী পুলিশের কার্যক্রম ও ঘটনা প্রসঙ্গে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির নাগরিক প্রতিদিনকে জানান, তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হলে তিনি হাতিরঝিল থানায় জিডি করেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আপডেট দেওয়া বা যোগাযোগ করা হয়নি।
শিশির অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রশাসন আমাকে কোনো আপডেট দেয়নি, একটি ফোনও করেনি। আমরা দেখছি, হাদিকে হত্যার আগে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও থ্রেট দেওয়া হয়েছিল, একই কায়দায় আমাদের বিরুদ্ধেও এখন হুমকি ছড়ানো হচ্ছে। এতে স্পষ্ট যে আমাদের হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও দাবি করেন, এসব হুমকির পেছনে উদ্দেশ্য হলো জুলাই সনদের চেতনাকে ভণ্ডুল করা এবং দেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলা। ‘যারা জুলাই সনদের পক্ষে থাকবে, তাদেরকেই টার্গেট করে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে,’ বলেন শিশির।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি দাবি করেন, তারা ন্যূনতম সহযোগিতাও পাচ্ছেন না এবং প্রশাসনের আচরণে পেশাদারিত্বের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শিশিরের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে নিজস্ব আইডি ব্যবহার করে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি প্রমাণ থাকার পরও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
শিশির আরও বলেন, ‘প্রশাসনের এই খামখেয়ালি ও উদাসীন মনোভাবের পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না—সেটিও এখন প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।’
তবে এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘হত্যার হুমকির মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে পুলিশ নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেয়। কোনো জিডি থানায় করা হলে সেটি সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় এবং সাইবার সংশ্লিষ্ট হলে তা ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়।
ডিসি জানান, সাইবার ইউনিট প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে অভিযোগের উৎস শনাক্তের চেষ্টা করে। এ ধরনের তদন্তের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নেওয়া হয়। সাইবার ইউনিট থেকে মতামত বা প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে মামলা রুজু করে গ্রেপ্তারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
হত্যার হুমকির অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় উল্লেখ করে ডিসি মাসুদ আলম বলেন, ‘সব অভিযোগই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে অনেক সময় নানা ধরনের হুমকি আসে, যার সবগুলোতেই তাৎক্ষণিকভাবে মামলা হয় না, অভিযোগের প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের মাধ্যমে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
ডিসি মাসুদ আরও বলেন, ‘পুলিশ নিজেরাও বিভিন্ন সময় হুমকি পেয়ে থাকেন, কিন্তু প্রতিটি বিষয় আইনগত কাঠামোর মধ্যেই মূল্যায়ন করা হয়। অভিযোগ পেলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
সারাদেশে এনসিপির নেতাদের হত্যার হুমকির ঘটনায় বিভিন্ন থানায় করা জিডি বা অভিযোগ-পরবর্তী পুলিশের কার্যক্রম বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি ইনামুল হক সাগরকে সোমবার দুপুরে ফোন করা হয়। ফোন না ধরলে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন করা হয়। তবে তিনি গতকাল রাত আটটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া দেননি।