ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২০২৮ প্রার্থীর মধ্যে এক হাজার ৩৬৫ প্রার্থীই ন্যূনতম ভোটের শর্ত পূরণ করতে পারেননি।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসকল প্রার্থী প্রাপ্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ বা ১২ দশমিক পাঁচ শতাংশ ভোটও পাননি। ফলে নির্বাচন আইনের বিধান অনুযায়ী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৬৭.৩১ শতাংশ প্রার্থীই তাদের জামানত হারিয়েছেন।
এদিকে প্রার্থী প্রতি নির্বাচনী জামানত ৫০ হাজার টাকা হিসেব করে, এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার ফলে ইসির কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ছয় কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
দলভিত্তিক পর্যালচনায় দেখা যায়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫০ দলের ভেতর কোন না কোন প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন এমন দল রয়েছে ৪৭টি। যে সকল দলের কোন প্রার্থীই জামানত হারাননি তারা হলেন, বিএনপি, বিএনপির জোট সঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
নির্বাচনি জামানত হলো একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ, যা প্রার্থী হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হয়। এটি ট্রেজারি চালান তফসিলি ব্যাংকের পে-অর্ডার হিসেবে জমা দেওয়া যায়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনে গুরুত্বহীন বা নন-সিরিয়াস প্রার্থীর সংখ্যা কমানো। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জামানত জমা দিতে হয়।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। ফলে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী ন্যূনতম ভোটের শর্ত পূরণ করতে পারেননি।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী যদি তার নির্বাচনি এলাকায় মোট কাস্টিং (প্রদত্ত) ভোটের একটি নির্দিষ্ট অংশ পেতে ব্যর্থ হন, তবে তার জামানত সরকারি কোষাগারে জমা হয়ে যায়। সংসদ নির্বাচনের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী যদি প্রদত্ত ভোটের সাড়ে ১২ শতাংশ বা এক-অষ্টমাংশ ভোট না পান, তবে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পর কমিশন জামানত হারানো প্রার্থীদের একটি তালিকা তৈরি করে। যারা ন্যূনতম ভোট পেয়ে জামানত রক্ষা করতে পেরেছেন, তারা গেজেট প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় আবেদন সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন অফিস থেকে তাদের অর্থ ফেরত নিতে পারেন। তবে তথ্যমতে, অনেক প্রার্থী জামানত রক্ষার মতো ভোট পেলেও পরে এই অর্থ ফেরত নেওয়ার জন্য আবেদন করেন না।
জেলাভিত্তিক চিত্র: ঢাকায় সবচেয়ে বেশি, চুয়াডাঙ্গা-বান্দরবানে কম
ইসির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি ১৫৭ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। রাজধানীসহ জেলার ২০টি আসনে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী ন্যূনতম ভোটের শর্ত পূরণ করতে পারেননি।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে চুয়াডাঙ্গা ও বান্দরবান জেলায়, যেখানে তিনটি আসনে মাত্র দুইজন করে প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।
বড় জেলাগুলোর মধ্যে কুমিল্লায় ৫৯, চট্টগ্রামে ৭৭, ময়মনসিংহে ৩৭, নারায়ণগঞ্জে ৩৬, কিশোরগঞ্জে ৩৪, গাজীপুরে ৩২ জন এবং রংপুরে ৩১ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জামানত বাজেয়াপ্ত
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের। দলটির ৬২ জেলার ২৪৮টি আসনে মনোনীত প্রার্থীরা ন্যূনতম ভোটের শর্ত পূরণ করতে না পারায় তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
এর ফলে দলটি থেকে এক কোটি ২৪ লাখ টাকা ইসির কোষাগারে জমা হয়েছে।
জাতীয় পার্টির তিন অংশ থেকে কোটি টাকার বেশি জামানত বাজেয়াপ্ত
নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টির তিনটি অংশ, লাঙ্গল প্রতীকের জাতীয় পার্টি, বাইসাইকেল প্রতীকের জাতীয় পার্টি (জেপি) ও কাঠাল প্রতীকের বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, এই তিন অংশের মোট ২০৯ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ফলে দলগুলোর কাছ থেকে এক কোটি চার লাখ টাকা পাচ্ছে ইসি।
গণঅধিকার ও গণসংহতিও পিছিয়ে নেই
সরকারের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনে অনেক প্রার্থী ন্যূনতম ভোট না পাওয়ায় গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের কাছ থেকে ৫৪ লাখ টাকা জামানত যাচ্ছে ইসির কোষাগারে।
এর মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের ৯২ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ায় ৪৬ লাখ টাকা ও গণসংহতি আন্দোলনের ১৬ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ায় আট লাখ টাকা জমা হচ্ছে।
বাম দলগুলো থেকে ৯০ লাখ টাকা
বাম ঘরানার ছয়টি দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মোট ১৮১ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জামানত হারিয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। তাদের ৬৩ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
এসব দল থেকে মোট ৯০ লাখ টাকা ইসির কোষাগারে জমা হচ্ছে।
ইসলামী ছোট দলগুলোর ১১৬ প্রার্থী
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াত ছাড়া আরও ১০টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের ১১৬ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এই দলগুলোর মধ্যে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ২০ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ১৯ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ১৮ জন ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ১৭ জন প্রার্থী জামানত হারিয়েছে।
এই ১০টি দল মিলিয়ে ৫৮ লাখ টাকার বেশি জামানত ইসি পাচ্ছে।
বিরোধী জোটের অংশ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মোট ১১ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ফলে এই দুই দল থেকে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা ইসির কোষাগারে যাচ্ছে।
ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বড় অংশ
ইসির তথ্য অনুযায়ী, বড় দলগুলোর বাইরে ১৮টি ছোট রাজনৈতিক দল ও ২১৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এই অংশ থেকেই সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ জমা হয়েছে।
ছোট ১৮টি দল থেকে প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের থেকে এক কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সব মিলিয়ে এই অংশ থেকে দুই কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ইসির কোষাগারে জমা হয়েছে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৪৭টি দলের অন্তত একজন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দলের মাত্র একজন করে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ায় প্রতিটি দল থেকে ৫০ হাজার টাকা করে ইসি পাচ্ছে।
এই দলগুলো হলো, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, গণতন্ত্রী পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)।