ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধান
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গোপনে চীনের উন্নত স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তি সংগ্রহ করেছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এই প্রযুক্তির সঙ্গে তেহরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সম্পর্ক রয়েছে।
ফাঁস হওয়া বাণিজ্যিক ও জাহাজ পরিবহনসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে রোববার (২৪ মে) ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনটি তুলে ধরেছে, আমিরাতের একটি কোম্পানি কীভাবে আইআরজিসির কাছে সংবেদনশীল যোগাযোগ প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে সহায়তা করেছিল, যারা পরে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশটিতে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
নথিগুলোতে আরও দেখা যায়, কীভাবে চালানটির প্রকৃত গন্তব্য গোপন রাখা হয়েছিল এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তা পাঠানোর জন্য জটিল কৌশল ব্যবহার করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে আমিরাতের রাস আল-খাইমাহ শহরের টেলিসান নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে চীনে তৈরি সামরিকমানের স্যাটেলাইট অ্যান্টেনা সরঞ্জাম সংগ্রহ করে আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স।
চীনে তৈরি ওই সরঞ্জাম সাংহাই থেকে পাঠানো হয় এবং দুবাইয়ের জেবেল আলি কনটেইনার বন্দরের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ইরানে পৌঁছায়।
পরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা অভিযানে আরব আমিরাত অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান উপসাগরীয় দেশটিতে ২ হাজার ৮০০টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু ছিল।
এর প্রতিক্রিয়ায় আবুধাবি তেহরানের প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এই তথ্যগুলোকে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ইরানি অফশোর ব্যবসাগুলোর জন্য আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, আমিরাতের বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলগুলোতে নজরদারি কিছুটা শিথিল হওয়ায়, তা নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার এবং অবৈধভাবে সরঞ্জাম সংগ্রহের নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ করে দেয়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে আসা চালানপত্র, কাস্টমস ঘোষণা, প্যাকিং তালিকা ও পরিবহন নথি অনুযায়ী, চীনা নির্মাতা স্টারউইনের তৈরি ৪ দশমিক ৫ মিটার মোটরচালিত স্যাটেলাইট অ্যান্টেনা সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল টেলিসান।
প্রায় ১ দশমিক ৮ টন ওজনের ওই চালানকে কাস্টমস নথিতে ‘অ্যান্টেনা ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সরঞ্জামটি প্রথমে ঝং গু ইন চুয়ান নামের একটি চীনা কনটেইনার জাহাজে করে সাংহাই থেকে দুবাইয়ের জেবেল আলি কনটেইনার টার্মিনাল-১ এ আনা হয়।
ব্রিটিশ পত্রিকাটির পর্যালোচনা করা জাহাজ চলাচলের নথি অনুযায়ী, জাহাজটি ২৮ আগস্ট দুবাইয়ে পৌঁছায় এবং সেখানে একটি কনটেইনার খালাস করা হয়, যা পরে রামা থ্রি নামের একটি ইরানি জাহাজ সংগ্রহ করে।
নথি বলছে, ২৩ নভেম্বর রামা থ্রি একই জেটিতে ভেড়ে এবং একদিন পর চালানটি নিয়ে ইরানের উদ্দেশে রওনা দেয়।
তবে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সামুদ্রিক জিপিএস তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি জাহাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া নৌ তথ্য পাঠিয়েছিল, যাতে তার গতিবিধি গোপন রাখা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রামা থ্রির জিপিএস সংকেত বলছিল, জাহাজটি উপসাগর ছেড়ে ওমানের কাছাকাছি কিছু সময় অবস্থান করেছিল। কিন্তু ২৫ নভেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, জাহাজটি আসলে সেই অবস্থানে ছিল না, যে স্থানাঙ্ক সে আশপাশের জাহাজগুলোকে পাঠাচ্ছিল।
২৯ নভেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের বন্দর আব্বাসে অবস্থিত শহীদ রাজাই বন্দরে রামা থ্রির আকার, গঠন ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল থাকা একটি জাহাজকে নোঙর করা অবস্থায় দেখা যায়।
চালানসংক্রান্ত নথিতে একই বন্দরকে পণ্যের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। চালানটি পাঠানো হয়েছিল ইরানের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এরতেবাতাত ফারাগোস্তার কিশের (ইএফকে) নামে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের পর্যালোচনা করা একটি চুক্তি অনুযায়ী, টেলিসান ইএফকের পক্ষে সরঞ্জামটি সংগ্রহ করেছিল। এটি আরেকটি ইরানি প্রতিষ্ঠান সামান ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পের জন্য ব্যবহারের কথা ছিল।