শনিবার (২৩ মে) মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের নজিরবিহীন অনিয়ম নিয়ে নাগরিক প্রতিদিনে সংবাদ প্রকাশের পর গোটা ক্যাম্পাসজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। চারদিকে এখন একটাই প্রশ্ন—প্ল্যানিং কমিটি কর্তৃক আবেদনপত্র সরাসরি বাতিল হওয়ার পরও কীভাবে নিয়োগ পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেলেন আলোচিত প্রার্থী সাফিয়া আফরিন?
তদন্তের গভীরে নামতেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। একদিকে বর্তমান বিভাগীয় প্রধানের দাবি, সবকিছু নিয়মের ভেতরেই হয়েছে; অন্যদিকে তৎকালীন প্ল্যানিং কমিটির সভাপতির স্পষ্ট হুংকার—‘সব মিথ্যা, জালিয়াতির আলামত স্পষ্ট!’ দুই শীর্ষ কর্তার এই চরম কাদা ছোড়াছুড়ির মাঝেই নাগরিক প্রতিদিনের অনুসন্ধানী দল ‘দ্য ব্লুপ্রিন্ট’ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে অপরাধের সঠিক তথ্য।
সাফিয়া আফরিনের এন্ট্রি প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে নাগরিক প্রতিদিনের পক্ষ থেকে কথা বলা হয় ফার্মেসি বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফ আলীর সঙ্গে। তৎকালীন প্ল্যানিং কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি এক তত্ত্ব হাজির করেন।
ড. আশরাফ আলীর দাবি, প্ল্যানিং কমিটি সাফিয়া আফরিনসহ ৮ জনের আবেদনপত্র বাতিল করে রেজিস্ট্রার বিভাগের কাছে একটি বিশেষ সুপারিশ পাঠিয়েছিল। সেই সুপারিশে নাকি বলা হয়েছিল এই ৮ জনের মধ্যে কেউ যদি তার এনওসি বা অনাপত্তিপত্র দেখাতে সক্ষম হন, তবে রেজিস্ট্রার বিভাগ যেন যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করে দেয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেই লিখিত সুপারিশের ওপর ভর করেই সাফিয়া আফরিন শেষমুহূর্তে এনওসি জমা দেন এবং পরীক্ষায় বসার গ্রিন সিগন্যাল পান!
এদিকে বর্তমান চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে! ড. আশরাফ আলীর এই দাবি এককথায় উড়িয়ে দেন প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান।
তিনি নাগরিক প্রতিদিনের কাছে স্পষ্ট ভাষায় বর্তমান চেয়ারম্যানের দাবিকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘প্ল্যানিং কমিটি এ ধরনের কোনো লিখিত বা মৌখিক সুপারিশ কখনোই করেনি!’
ড. মিজানুর রহমান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আরও বলেন, ‘যদি সাফিয়া আফরিন এনওসি জমা দিয়েও থাকেন, তবে নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রার বিভাগের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই প্ল্যানিং কমিটিকে অফিসিয়ালি জানানোর কথা ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি। নিজের আগের বক্তব্যে অনড় থেকে তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন, প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত সাফিয়া আফরিনের সেই তথাকথিত এনওসির কাগজ তাকে অফিসিয়ালি দেখানোই হয়নি!
একই বিভাগের দুই প্রভাবশালী শিক্ষকের এই মিশ্র ও সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রমাণ করে, পর্দার আড়ালে এক বিশাল ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ড. মো. মিজানুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘নিয়োগ অনিয়ম সংক্রান্তে এখন পর্যন্ত যেসব ইস্যু সামনে এসেছে, সংশ্লিষ্ট উচ্চ কর্তৃপক্ষ যদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে, তবে আসল সত্য বা থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট অনিয়ম ও জালিয়াতির আলামত পানির মতো পরিষ্কার।’
এদিকে অলোচনার তীর যেই সাফিয়া আফরিনের দিকে, সেই সাফিয়া আফরিন দিলেন বিস্ফোরক তথ্য। তিনি দাবি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য ১০ কপি আবেদনপত্র জমা দিতে হয়। তিনি তার মূল আবেদনপত্রের সঙ্গে এক কপি এনওসি জমা দিয়েছিলেন। তাহলে ঠিক কী কারণে রেজিস্ট্রার বিভাগ প্ল্যানিং কমিটির কাছে পাঠানো নথিতে সাফিয়া আফরিনের এনওসি সংযুক্ত করেনি, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তৎকালীন ভিসি, বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান, রেজিস্ট্রার, প্ল্যানিং কমিটির চেয়ারম্যান এবং সাফিয়া আফরিনের বক্তব্যের কোনো মিল বা যোগসূত্র পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বিভাগের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান যখন এনওসির বৈধতা আর অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত, ঠিক তখনই শেষ পর্যায়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—এত বড় বিদ্যাপিঠে বসে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে কারা।
খুব শিগগির ছক কাটা এই অনিয়মের মুখোশ উন্মোচন করতে যাচ্ছে নাগরিক প্রতিদিন। চোখ রাখুন পরবর্তী প্রতিবেদনে।