রাজধানীর ব্যস্ততম মৌচাক এলাকা। সাধারণ মানুষের চিরচেনা কোলাহল আর কেনাকাটার ব্যস্ততা শেষ হতে না হতেই এক রক্তাক্ত মুহূর্তের সাক্ষী হলো আনারকলি মার্কেটের সামনের চত্বর। প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে খুন হলেন মগবাজারের পরিচিত বিএনপি নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার। ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই হত্যাকাণ্ডে এসেছে নতুন মোড়। পুলিশের খাঁচায় ধরা পড়েছে দুই ঘাতক। কিন্তু অনুসন্ধানে বড় যে প্রশ্নটি রয়েছে তা হলো—সাধারণ এক তর্কাতর্কি থেকেই কি এই খুন, নাকি পেছনে লুকিয়ে আছে স্থানীয় আধিপত্য আর রাজনীতির গোপন কিছু?
সোমবার (০৮ জুন) রাতে হত্যাকাণ্ডের পরপরই অপরাধীদের ধরতে চিরুনি অভিযানে নামে রমনা থানা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে মাত্র একদিনের মাথায় মুন্সিগঞ্জ ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় দুজনকে। মঙ্গলবার (০৯ জুন) সকালে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন নিশ্চিত করেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রিয়াজুল ইসলাম ও আল আমিন মাহিন নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কিন্তু যখনই এই দুজনের রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এলো, তখনই চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল রাজনৈতিক অঙ্গনে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আল আমিন মাহিন মূলত ১৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং রিয়াজুল ইসলাম একই ওয়ার্ডের একজন সক্রিয় কর্মী। এরপরই প্রশ্ন ওঠে—দলীয় কোন্দলের জেরেই কি প্রাণ দিতে হলো বিএনপি নেতা বিল্লালকে?
রমনা জোনের ডিসি শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, নিহতের পরিবার বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর সূত্র। ঘটনার দিন স্থানীয় যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম ও তার অনুসারীদের সঙ্গে নিহত বিল্লাল হোসেনের কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি ও তীব্র তর্কাতর্কির সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। দিদারুলের ইশারায় তার অনুসারীরা চারদিক থেকে ঘিরে ধরে বিল্লাল হোসেনকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুকে ও পিঠে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় ঘাতকেরা।
হত্যাকাণ্ডের পর নিজেদের পিঠ বাঁচাতে তৎক্ষণাৎ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় কেন্দ্রীয় যুবদল। ঘটনার মূল অভিযুক্ত হিসেবে আলোচনায় আসা দিদারুল ইসলামকে এরমধ্যেই সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক রঙ দেখবে না প্রশাসন। ডিসি এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘ঘটনায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধে সম্পৃক্ততাকেই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আরও যারা এই কিলিং স্কোয়াডে জড়িত রয়েছে, তাদের আটকের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’
কিন্তু মগবাজারের স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে অন্য কথা। রাস্তায় প্রকাশ্যে একজন সিনিয়র নেতাকে এভাবে কোপানোর সাহস ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের এই যুবদল কর্মীরা কীভাবে পেল? দিদারুল ইসলামের সঙ্গে বিল্লাল হোসেনের বিরোধ কি কেবলই তাৎক্ষণিক তর্কাতর্কি, নাকি এর পেছনে স্থানীয় ফুটপাত, চাঁদাবাজি কিংবা অভ্যন্তরীণ পদের কোনো গভীর কোন্দল আগে থেকেই জমাট বাঁধছিল?
মগবাজারের এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের গতিও বাড়িয়েছে পুলিশ। তবে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। একটি সাধারণ তর্কাতর্কি কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণঘাতী হামলায় রূপ নিতে পারে, তা ভাবিয়ে তুলছে তদন্তকারীদেরও। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এ ঘটনায় থাকা আরও কয়েকজনকে ইতোমধ্যেই শনাক্ত করেছে পুলিশ।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—গ্রেপ্তারকৃত মাহিন ও রিয়াজুলের রিমান্ড শেষে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ডের নাম বেরিয়ে আসে কি না। নাকি দিদারুলকে বহিষ্কার করেই আড়াল করে দেওয়া হবে নেপথ্যের আসল কারিগরদের?