নেত্রকোনার গ্রামাঞ্চলে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছেন একদল কৃষক-কৃষাণি। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে তারা গড়ে তুলেছেন এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ উদ্যোগ এখন অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) নেত্রকোনা অঞ্চলের সম্পদ ব্যক্তি, এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক এবং শতবাড়ীর কৃষক-কৃষাণিদের অংশগ্রহণে মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে এগ্রোইকোলজি বিষয়ক কর্মশালা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা টেকসই কৃষি, খাদ্য সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, মাটির উর্বরতা রক্ষা, পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, জৈব সার প্রস্তুত ও ব্যবহার এবং বাড়ির আঙিনার প্রতিটি স্থানকে উৎপাদনের আওতায় আনার মাধ্যমে কৃষক-কৃষাণিরা টেকসই কৃষির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের এই উদ্যোগ শুধু পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণই করছে না, বরং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থারও বিকাশ ঘটাচ্ছে।
কর্মশালার অংশ হিসেবে শতভাগীর ১৩টি গ্রামের ২৬ জন কৃষক-কৃষাণি মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন কৃষি কৌশল সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সফলতার গল্প একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করেন।
লার্নিং সেন্টারের কৃষাণি কবিতা আক্তার নিজ বাড়ির চত্বরকে কীভাবে একটি উৎপাদনমুখী কৃষি ব্যবস্থায় রূপ দিয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। বাড়ির চারপাশে সবজি বাগান, মাচাভিত্তিক চাষাবাদ এবং স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা উপস্থিতদের মুগ্ধ করে।
বিশনাথপুর গ্রামের কৃষাণি মরজিনা বেগম বলেন, ‘এই বাড়ির মাচার নকশাগুলো অত্যন্ত সুন্দর ও নান্দনিক। মাচার চারপাশে পুঁইশাক ও বেগুন চাষ এবং জীবন্ত বেড়া তৈরির বিষয়টি আমার খুব ভালো লেগেছে।’
রামেশ্বরপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষাণি চিনু রানী বলেন, ‘পুকুরপাড়ের মাচায় সবজি চাষ, মাচার চারপাশে পেঁপে ও বেগুনের বাগান করা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় লেগেছে। বাড়ির কোনো জায়গাই অব্যবহৃত নেই। গোবর সার, ফেরোমন ফাঁদ, মরিচগুঁড়া ও ছাই ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়।’
একই গ্রামের কৃষক সাগেদ আহমদ খান বাচ্চু বলেন, ‘এটি বারমাসি সবজি চাষের এক অনন্য উদাহরণ। আমরা সবাই আমাদের বাড়ির জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।’
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি গ্রামে একটি করে এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার গড়ে উঠলে কৃষির ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কৃষক, উৎপাদক ও ভোক্তার অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।